ফিতা কেটে পিতার স্বপ্নের হাসপাতাল উদ্বোধন করলেন মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের – ২২ বছর পর পূরণ হলো এ.কে.এম. আবু তাহেরের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন

 

মোঃ আনজার শাহ

পিতার স্বপ্নের হাসপাতাল উদ্বোধন:
কুমিল্লা জেলার বরুড়া উপজেলার সোনাইমুড়ীতে “এ.কে.এম. আবু তাহের ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল”-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন বলেন, “মনটা ভীষণ খারাপ। প্রায় ২২ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে আমার বাবার এই স্বপ্নটা পূরণ করতে।” তিনি বলেন, তাঁর বাবা শুধু এই দেশের ও এলাকার মানুষের কথা চিন্তা করেই এই হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন।

মন্ত্রী বলেন, “মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন চিকিৎসা। মানুষ অসুস্থ হলে বাড়ি-ঘর-জমি বিক্রি করে সুস্থ হওয়ার চেষ্টা করে। তখনই তিনি ভাবতেন, এলাকার দরিদ্র মানুষদের জন্য কী করা যায় সেই চিন্তা থেকেই এই হাসপাতালের জন্ম।”

রাজনীতির ঊর্ধ্বে জনসেবার আহ্বান:
মন্ত্রী অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক কারণে দীর্ঘদিন হাসপাতালটি অচল পড়ে ছিল। তিনি বলেন, “হাসপাতালটি কোনো দলের জন্য করা হয়নি, করা হয়েছে সাধারণ মানুষের জন্য। আমার বাবা কখনো কোনো প্রতিষ্ঠান-স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা বা হাসপাতাল দলের জন্য গড়েননি, সবই করেছিলেন সর্বসাধারণের জন্য।”
তিনি আরও বলেন, তাঁর বাবা ছিলেন একটি উসিলামাত্র; সব সম্পদই আল্লাহর, এবং আল্লাহ কার হাত দিয়ে কী করাবেন তা তিনিই জানেন। “এই হাসপাতাল এখন আপনাদের এলাকার সব মানুষের। এর দেখভাল ও ভালো চিন্তা করা আপনাদের দায়িত্ব। আমার কাজ আমি করে দিয়েছি।”

আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ চালু:
মন্ত্রী জানান, ইনশাআল্লাহ আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে। তিনি বলেন, “সবার দোয়া ও আল্লাহর সহায়তায় এই সরকারের আমলে চেষ্টা করব এটিকে ৫০ শয্যায় রূপান্তর করতে। আপাতত ২০ শয্যাই যথেষ্ট, তবে জরুরি বিভাগ ছাড়াও চাহিদা বাড়ছে। ডাক্তার-নার্স সংকট রয়েছে; ২৫ শয্যা হলে একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল হয়ে উঠবে।”
তিনি বলেন, সরকার মেগা প্রকল্পের চেয়ে জনগণের প্রকৃত উপকারে আসে এমন কাজে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। “প্রতিটি উপজেলায় ১৫১ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে নেওয়া হয়েছে, যেখানে থাকবে আইসিইউ, সিসিইউ, এইচডিইউ, ডায়ালিসিস সেন্টার, মা ও শিশুদের জন্য পৃথক কর্নার এবং প্রবীণ ও দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের জন্য ফিজিওথেরাপি ওয়ার্ড।”

উপজেলায় ১৫১ শয্যার হাসপাতাল পরিকল্পনা:
মন্ত্রী বলেন, লক্ষ্য একটাই উপজেলার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ যেন উপজেলার মধ্যেই সর্বাত্মক চিকিৎসাসেবা পান এবং কুমিল্লা বা ঢাকায় যাওয়ার প্রয়োজন না পড়ে। “প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আমার মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে ডিপিপি (প্রকল্প প্রস্তাব) প্রস্তুত করছে। আগামী এক-দুই মাসের মধ্যে অনুমোদন পেলে কার্যক্রম শুরু হবে। এই সরকারের মেয়াদেই সব উপজেলায় এই হাসপাতাল নির্মাণ শেষ করতে চাই।”

মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনের আহ্বান:
সমাজকে সুস্থ রাখার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, “আগে গ্রামের মুরব্বিরা মিলে সিদ্ধান্ত নিতেন, সবাই তা মানতেন। আজ বাবা ছেলের কথা শোনে না, ভাই ভাইয়ের কথা শোনে না। মাদক প্রতিটি গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে। মাদকের মতো বড় ব্যাধি আর নেই পরিবারে একজন আসক্ত হলে পুরো পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়।”
তিনি বলেন, এলাকার মানুষ প্রায় সবাই জানেন কে মাদকের সঙ্গে জড়িত, কিন্তু প্রতিরোধ করেন না। “নিজের ঘরে সমস্যা না হওয়া পর্যন্ত মানুষ সচেতন হয় না। এটিকে সামাজিক আন্দোলন হিসেবে নিতে হবে। শুধু প্রশাসন বা পুলিশ একা এটি বন্ধ করতে পারবে না, আপনাদেরও সহায়তা প্রয়োজন।”

মাদকবিরোধী কমিটি গঠনের আহ্বান:
মন্ত্রী বলেন, “অসুস্থ হওয়ার আগেই প্রতিরোধ নিতে পারলে হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজনই পড়বে না। প্রতিটি গ্রাম, ওয়ার্ড ও ইউনিয়নে মাদকবিরোধী ক্যাম্পেইন ও কমিটি গঠন করুন এবং পুলিশকে পূর্ণ সহযোগিতা করুন, যাতে তারা মাদক কারবারিদের ধরতে পারে। আগামী সংসদেই মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর আইন পাস হতে যাচ্ছে। বর্তমানে মাদক মামলায় ধরা পড়লে ১৫-২০ দিনের মধ্যে জামিন হয়ে যায় নতুন আইনে এটি আর সম্ভব হবে না।”
তিনি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “বিএনপির কোনো নেতা যদি কোনো মাদক কারবারিকে প্রশ্রয় দেন বা তার মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কারও রাজনীতি করার যোগ্যতা নেই। সাম্প্রতিক সময়ে মাদকাসক্তির কারণে নিজের মাকে হত্যার মতো ঘটনাও ঘটেছে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় মানুষ বিবেকবোধ হারিয়ে ফেলে।”

পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র ও শিক্ষা উন্নয়নের ঘোষণা:
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বরুড়া দক্ষিণে নাগির পাড়ে একটি পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী। এতে আশপাশের কয়েকটি ইউনিয়ন অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যাতে দক্ষিণ অংশের মানুষ সেবাবঞ্চিত না হন।

শিক্ষা খাতের উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “গত ১৫ বছরে যে কাজ হয়নি, এই সরকারের পাঁচ বছরে তার চেয়ে বেশি কাজ করার চেষ্টা করব। এলাকার শতবর্ষী পুরনো বিদ্যালয়গুলোকে সরকারিকরণের প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এলাকার শিক্ষাখাতে বাড়তি বরাদ্দ নিশ্চিত করার আশ্বাস পাওয়া গেছে, কারণ দীর্ঘদিন এই উপজেলা উন্নয়ন-বঞ্চিত ছিল।”

বিদ্যুৎ সংকট ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা:
বিদ্যুৎ সংকট প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, “গত দেড় দশকের জঞ্জাল সামলাতেই সরকারের বেশিরভাগ সময় ব্যয় হচ্ছে। এর মধ্যে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের আন্তর্জাতিক মূল্য বহুগুণ বেড়ে গেছে যে তেল আগে ব্যারেলপ্রতি ২৫-৩০ ডলারে কেনা যেত, এখন তা প্রায় ১০০ ডলারে কিনতে হচ্ছে; গ্যাসের দামও আট-নয় ডলার থেকে বেড়ে ৩০-৩১ ডলার হয়েছে। এর ফলে দেশে প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে, কারণ পর্যাপ্ত গ্যাস না পেলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না।”
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী দিনরাত পরিশ্রম করছেন পরিস্থিতি উত্তরণে, এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। “একটি শিক্ষিত জাতি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই স্বাবলম্বী হয়, কর্মসংস্থান ও ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ে। গত সরকারের আমলে শিক্ষাব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এবার পরীক্ষায় নকলমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে, কারণ সরকার প্রকৃত অর্থে জাতির মানোন্নয়নে আন্তরিক।”

কুমিল্লা বিভাগ গঠনের ঘোষণা:
সাংবাদিক আনজার শাহের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, “আল্লাহর ইচ্ছায় যথাসময়ে তা হবে। আমরা চেষ্টা অব্যাহত রাখব। আমার বিশ্বাস, এই সরকারের মেয়াদকালেই কুমিল্লা বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হবে।”

পিতার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা
অনুষ্ঠানের শেষে আবেগাপ্লুত হয়ে মন্ত্রী বলেন, “আজকের অনুষ্ঠান মূলত মিলাদ মাহফিলের জন্য নির্ধারিত ছিল। আজ(২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬) আমার বাবার মৃত্যুবার্ষিকী সবার কাছে অনুরোধ, তাঁর জন্য দোয়া করবেন। বরুড়া নিয়ে বাবার যে স্বপ্ন ছিল, আপনাদের সঙ্গে নিয়ে যেন তা পূরণ করতে পারি, এটাই চাওয়া। আগামী পাঁচ বছরে।

উল্লেখ্য, হাসপাতাল গেটে লাল ফিতা কেটে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমনসহ তাহের পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ২০ শয্যাবিশিষ্ট এ.কে.এম. আবু তাহের হাসপাতালটি উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মন্ত্রীর সহধর্মিণী নাজনীন আহমেদ, মন্ত্রীর ছোট ভাই আবু নাসের ইয়াহিয়া শারমিনের বড় ছেলে রায়হান তাহের এবং মন্ত্রীর মেয়ে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বরুড়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি কায়সার আলম।

পরিশেষে মন্ত্রী বলেন, ইনশাআল্লাহ, বরুড়াকে একটি আদর্শ উপজেলায় পরিণত করার সর্বাত্মক চেষ্টা করব। সবাই ভালো থাকবেন।”আর আমার মরহুম পিতার আত্মার মাগফিরাতের জন্য দোয়া করবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *