তালার নিচে চাপা পড়ছে জীবন: চিতড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সেবা নেই, বন্ধ দরজায় মাথা কুটছেন রোগীরা

ক্রাইম রিপোর্টার :

জনগণের করের টাকায় গড়া ভবনটি দাঁড়িয়ে আছে নির্বিকার। দরজায় ঝুলছে তালা, আর সেই তালার সামনে অসুস্থ শরীর নিয়ে বারবার ফিরে যাচ্ছেন সেবাপ্রত্যাশী মানুষ। কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার চিতড্ডা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে ভবন আছে, অবকাঠামোও আছে; নেই কেবল নিয়মিত সেবা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের পর দিন কেন্দ্রটি বন্ধ থাকে। কখনো খুললেও দায়িত্বপ্রাপ্ত সেবাদানকারীদের দেখা মেলে না; আবার কোনো কোনো দিন কয়েক ঘণ্টা পরেই বন্ধ হয়ে যায় দরজা। ফলে সাধারণ চিকিৎসা, পরিবার পরিকল্পনা ও মাতৃস্বাস্থ্যসেবার জন্য রোগীদের ছুটতে হয় পাশের ইউনিয়নে।

সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এসব কেন্দ্রে সাধারণ চিকিৎসা, পরিবার পরিকল্পনা, মা ও শিশুস্বাস্থ্য এবং প্রজননস্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার কথা। কিন্তু বাসিন্দাদের দাবি, বাস্তবে এসব সেবা নিয়মিত মিলছে না।
সপ্তাহে এক-দুই দিনের খোলা দরজা
স্থানীয়দের ভাষ্য, কখনো সপ্তাহে এক-দুই দিন কেন্দ্র খোলা থাকে, আবার অনেক সময় টানা বন্ধ পড়ে থাকে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীদের অনেককে দরজায় তালা দেখে হতাশ মনে ফিরে যেতে হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. ওয়াসিম বলেন, “আমার বাড়ি হাসপাতালের পাশেই। মানুষের সেবার উদ্দেশ্যেই এটি করা হয়েছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এখান থেকে কেউ সেবা পায় না। হাসপাতাল খুলবে কি না, ডাক্তার আসবেন কি না এ প্রশ্ন করার মতো কাউকেও পাওয়া যায় না।”
তিনি আরও বলেন, “মাঝেমধ্যে একজন ডাক্তার আসেন, কিছুক্ষণ থাকেন, আবার চলে যান। রোগীরা এসে বন্ধ দেখে এখন আর এখানে আসতে চান না।”
আরেক বাসিন্দা আব্দুল হাকিম বলেন, “তাঁদের ইচ্ছা হলে সপ্তাহে এক-দুই দিন খোলেন, ইচ্ছা না হলে বন্ধ রাখেন। এভাবেই চলছে এই ক্লিনিক।”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভের আগুন:
কেন্দ্রটির অনিয়মিত কার্যক্রম নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। কেউ লিখেছেন, যেদিনই যান, সেদিনই বন্ধ পান। কেউ জানিয়েছেন, কেন্দ্র বন্ধ পেয়ে তাঁকে পাশের ঝলম ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, নিজ ইউনিয়নে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকা সত্ত্বেও প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য অন্যত্র যেতে হওয়ায় রোগীদের সময় ও অর্থ—দুটিই অপচয় হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী ও জরুরি চিকিৎসাপ্রত্যাশী রোগীরা।

অভিযোগ অস্বীকার দায়িত্বপ্রাপ্তের:
তবে নিয়মিত অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা নাজমা আক্তার।
তিনি বলেন, “আমি একজন বয়স্ক মানুষ। তারপরও সপ্তাহে তিনটি স্থানে দায়িত্ব পালন করতে হয়। সপ্তাহে দুই দিন চিতড্ডায় থাকি, এক দিন স্যাটেলাইট কেন্দ্রে এবং বাকি দিন আড্ডা কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করি।” কয়েক ঘণ্টা অফিস করে চলে যাওয়ার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।

ওষুধ-সংকটের স্বীকারোক্তি:
বরুড়া উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রোকসানা আক্তার স্বীকার করেছেন, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট রয়েছে। অনেক কেন্দ্রে ওষুধ নেই বললেই চলে; তবু যা আছে, তা দিয়েই সেবা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, “আমি যখনই ফোন দিই, তাঁরা বলেন ম্যাডাম, অফিসে আছি। বাকিটা তো আর জানি না। তারপরও বিষয়টি জানতে আমি আবার ফোন করছি।”

তদন্ত ও নিয়মিত পরিদর্শনের দাবি:
কেন্দ্রটি নির্ধারিত সময়ে খোলা হচ্ছে কি না, কর্মীরা যথাসময়ে উপস্থিত থাকছেন কি না এবং রোগীরা বাস্তবে কী সেবা পাচ্ছেন এসব বিষয়ে সরেজমিন তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
তাঁদের দাবি, কেন্দ্রের কার্যক্রম নিয়মিত পরিদর্শনের আওতায় আনতে হবে; একই সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করা এবং নির্ধারিত সময়ে কেন্দ্র খোলা রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। তাঁদের ভাষ্য, সরকারি অর্থে নির্মিত ভবন তালাবদ্ধ পড়ে থাকলে জনগণ তার সুফল পাবে না। নিয়মিত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতি নিশ্চিত হলে চিতড্ডার মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসার সংকট অনেকটাই কমবে।

স্থানীয় প্রতিবেদক সুজন মজুমদার বলেন, “সংবাদ সংগ্রহে আমাদের প্রায়ই বিভিন্ন অঞ্চলে যেতে হয়। চিতড্ডার এই কেন্দ্রের সামনে দিয়ে গেলেও বেশির ভাগ সময় তালাবদ্ধ দেখি। ফলে এলাকাবাসী অসুস্থ হলে তাঁদের অন্যত্র ছুটতে হয়।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *