অনলাইন সাংবাদিকতায় নতুন যুগের পথিকৃৎ তৌফিক ইমরোজ খালিদী

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বাংলাদেশের অনলাইন সাংবাদিকতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী আর নেই। ৫৯ বছর বয়সে লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে। তার দীর্ঘ কর্মজীবনে বাংলাদেশের অনলাইন সাংবাদিকতায় একাধিক নতুন ধারার সূচনা হয়েছে বলে সহকর্মী ও সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সাবেক সহকর্মী, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, সাংবাদিক, কলাম লেখক ও শিক্ষক আফসান চৌধুরী বলেন, নৈর্ব্যক্তিকভাবে সংবাদ উপস্থাপনের মাধ্যমে পাঠকের কাছে নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান ধরে রাখা ছিল তৌফিকের অন্যতম বড় অবদান।

বিবিসির পর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমেও তৌফিক খালিদীর সঙ্গে কাজ করা আফসান চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের বিভিন্ন সময়ে অনেকের অবস্থান বদলালেও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এখনো তার কাছে নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম। তার মতে, সংবাদ পরিবেশনে নৈর্ব্যক্তিকতা বজায় রাখাই ছিল তৌফিকের বড় অর্জন।

আফসান চৌধুরীর ভাষায়, অন্য অনেক সংবাদমাধ্যম যেখানে কোনো না কোনোভাবে ঘটনার অংশ হয়ে পড়ে, সেখানে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সংবাদ তৈরির প্রক্রিয়া ছিল বস্তুনিষ্ঠ। মতামত ও কলামের ক্ষেত্রে ভিন্নতা থাকলেও সংবাদকে বস্তুনিষ্ঠতার বাইরে যেতে দেননি তৌফিক।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের আধুনিক ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের যে যাত্রা, তার ঐতিহাসিক সূচনাকারীদের অন্যতম ছিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এবং তৌফিক খালিদী সেই উদ্যোগকে সফলভাবে এগিয়ে নিয়েছেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য মুশতাক হোসেনও তৌফিক খালিদীর ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। তার মতে, তৌফিক অনলাইন সাংবাদিকতাকে একটি মানসম্মত ও প্রতিশ্রুতিশীল জায়গায় নিয়ে গেছেন। প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে থাকা বিডিনিউজকে ধীরে ধীরে গড়ে তুলে আন্তর্জাতিক মানের একটি নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে পরিণত করেছিলেন তিনি।

দ্রুত বা চটকদার সংবাদ প্রকাশের পরিবর্তে কিছুটা দেরিতে হলেও যাচাই করা তথ্য প্রকাশ করা ছিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের অন্যতম নীতি। কোনো সংবাদ পরে ভুল প্রমাণিত হয়ে প্রত্যাহার করতে না হয়— এ বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হতো বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

অনলাইন সাংবাদিকতায় একাধিক নতুন উদ্যোগ

২০০৬ সালের ২৩ অক্টোবর তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নেতৃত্বে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ইন্টারনেটভিত্তিক সাংবাদিকতার নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয় বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের পর তৌফিক খালিদীর নেতৃত্বে এর কার্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। প্রতিষ্ঠানটি দেশের প্রথম ডটকম কোম্পানিতে রূপ নেয়।

আফসান চৌধুরী বলেন, তৎকালীন সময়ে সাধারণ মানুষকে ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের ধারণা বোঝানো সহজ ছিল না। তৌফিক নিজেও বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে এ বিষয়ে মানুষকে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটি সফল হয়ে ওঠে।

প্রতিষ্ঠার পর ‘সবার আগে নির্ভুল খবর’ নীতিকে সামনে রেখে সংবাদ পরিবেশন শুরু করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। তৌফিক খালিদীর নেতৃত্বে শিশুদের জন্য বাংলা ভাষার ওয়েবসাইট ‘কিডজ’ এবং ইউনিসেফের সঙ্গে যৌথভাবে শিশু সাংবাদিকদের ওয়েবসাইট ‘হ্যালো’ চালু করা হয়।

এ ছাড়া মোবাইল ফোনে ব্রেকিং নিউজ সেবা এবং এসএমএসের মাধ্যমে বাংলায় সংবাদ দেওয়ার ব্যবস্থাও চালু করে প্রতিষ্ঠানটি।

চাপের মধ্যেও সংবাদ প্রকাশের নীতি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের দীর্ঘ পথচলা সব সময় নির্বিঘ্ন ছিল না। একটি ব্যবসায়ীর মামলা ও বিচারসংক্রান্ত পুরোনো সংবাদ সরাতে রাজি না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি একাধিক মামলার মুখে পড়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রধান সম্পাদক তৌফিক খালিদীও দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি মামলায় কয়েক বছর হয়রানির শিকার হন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ওই বছরের সেপ্টেম্বরে মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়।

২০১৮ সালে একজন সেনাপ্রধানের ভাইয়ের পরিচয় নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের পর কয়েক ঘণ্টার জন্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ওয়েবসাইট বন্ধ রাখা হয়েছিল। পরে ২০২৩ সালেও আরেক দফা ওয়েবসাইট বন্ধ থাকার পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চাপের মুখেও সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে আপস না করার কথা নিজেই বলেছিলেন তৌফিক খালিদী। ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে তারা উল্লেখযোগ্য লড়াই করেছেন এবং মাথা নত করেননি।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ওপর রাজনৈতিক নেতা, ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী ও ব্যবসায়ীদের চাপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছিলেন, বিভিন্ন সময়ে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা, হুমকি, হয়রানি ও অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলার চেষ্টা হয়েছে। তবে সবাই মিলে সেই লড়াই চালিয়ে গেছেন।

দীর্ঘ পথচলার চড়াই-উতরাইয়ের স্মৃতিচারণ করে তৌফিক খালিদী বলেছিলেন, সব সময় ভালো না থাকলেও তারা ভেসে থাকা, বেঁচে থাকা ও জেগে থাকার চেষ্টা করেছেন।

তরুণদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেওয়ার ইচ্ছা

প্রতিষ্ঠানের ১৮ বছর পূর্তির সময় নতুন প্রজন্মের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেওয়ার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছিলেন তৌফিক খালিদী।

তিনি বলেছিলেন, দীর্ঘ সময় প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বে থাকার পর তার সরে দাঁড়ানো উচিত ছিল। তবে সেই পরিবেশ তৈরি করতে না পারার কথাও স্বীকার করেছিলেন তিনি।

তরুণদের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেছিলেন, প্রতিষ্ঠানে অনেক যোগ্য, দক্ষ ও কর্মঠ সহকর্মী রয়েছেন, যারা ভালো সাংবাদিকতার জন্য নিজেদের সময় দিয়েছেন। তাদের নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতার ওপরও আস্থা প্রকাশ করেছিলেন তিনি।

তবে সেই ইচ্ছা বাস্তবায়ন দেখে যেতে পারলেন না তৌফিক ইমরোজ খালিদী। ৫৯ বছর বয়সেই তার জীবনাবসান হলো।

লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু

ব্যক্তিগত সফরে লন্ডনে থাকা অবস্থায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের পর ১ অক্টোবর রাতে তাকে লন্ডনের সেইন্ট বার্থোলমিউ’স হাসপাতালে নেওয়া হয়।

পরে স্থানীয় সময় শুক্রবার (২ অক্টোবর) দুপুর ২টা ২৩ মিনিটে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার বয়স হয়েছিল ৫৯ বছর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *