এক ক্যাথল্যাবেই ভরসা রংপুরের হৃদরোগীদের, বিকল আরেক মেশিন

রংপুর ব্যুরো:

উত্তরাঞ্চলের হৃদরোগীদের চিকিৎসার অন্যতম ভরসাস্থল রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালের ক্যাথল্যাব এখন চলছে একটি মেশিন দিয়ে। দুটি মেশিনের মধ্যে একটি প্রায় এক বছর ধরে বিকল হয়ে পড়ে থাকায় সচল মেশিনটির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা দিতে গিয়ে রোগীদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে। গুরুতর অবস্থায় থাকা অনেক রোগীকে চিকিৎসার জন্য ঢাকামুখী হতে হচ্ছে।

রমেক হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে স্থাপিত ক্যাথল্যাবে এনজিওগ্রাম, হৃদযন্ত্রের রক্তনালিতে স্টেন্ট বা রিং স্থাপন এবং পেসমেকার বসানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা দেওয়া হয়। উত্তরের আট জেলার রোগীরা নিয়মিত এসব সেবা নিতে হাসপাতালে আসেন। একটি মেশিন বন্ধ থাকায় সীমিত সক্ষমতার মধ্যেই চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, একটি মেশিন দীর্ঘদিন বিকল থাকায় সচল মেশিনটির ওপর চাপ কমাতে চিকিৎসাসেবায় রেশনিং পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট ধরনের চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে একদিকে রোগীদের সেবা দিতে সময় লাগছে, অন্যদিকে সচল মেশিনটির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়া ঠেকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

হৃদরোগ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জরুরি হৃদরোগ চিকিৎসার জন্য ২০১২ সালে ক্যাথল্যাবের দুটি ইউনিট চালু করা হয়। পরবর্তী সময়ে যান্ত্রিক ত্রুটিসহ নানা কারণে এর কার্যক্রম দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল। রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় চিকিৎসকদের প্রচেষ্টায় ২০১৯ সালের প্রথম দিকে আবার ক্যাথল্যাবের কার্যক্রম চালু হয়। এরপর থেকে নিয়মিতভাবে হৃদরোগীদের বিভিন্ন চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।

বর্তমানে সচল মেশিনের মাধ্যমে এনজিওগ্রাম, রিং স্থাপন ও পেসমেকার বসানোর কাজ চলছে। চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, রমেকের ক্যাথল্যাবে চিকিৎসার সফলতার হার ৯৯ দশমিক ২ শতাংশ। গত মাসে সেখানে ১১০টি এনজিওগ্রাম, ২০টি রিং ও সাতটি পেসমেকার স্থাপন করা হয়েছে।

হাসপাতাল সূত্র আরও জানায়, প্রতি সপ্তাহে গড়ে ২৫ থেকে ৩০ জন রোগী এনজিওগ্রামের জন্য ভর্তি হন। তাঁদের মধ্যে তিন থেকে পাঁচজনের রিং স্থাপনের প্রয়োজন হয়। প্রতি মাসে গড়ে দুই থেকে তিনটি স্থায়ী পেসমেকারও স্থাপন করা হয়।

এনজিওগ্রামের মাধ্যমে হৃদযন্ত্রের ধমনিতে ব্লক বা সংকোচন শনাক্ত করা হয়। প্রয়োজন হলে বেলুন বা স্টেন্ট বসিয়ে সংকুচিত বা বন্ধ রক্তনালি সচল করা হয়। কিন্তু একটি মেশিন বন্ধ থাকায় রোগীর চাহিদা অনুযায়ী এসব সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এতে চিকিৎসার জন্য অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।

গুরুতর রোগীদের কেউ কেউ বাধ্য হয়ে ঢাকায় যাচ্ছেন। তবে আর্থিকভাবে অসচ্ছল রোগীদের অনেকেই ঢাকায় গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য রাখেন না। ফলে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অনেকে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আর্থিক সক্ষমতা থাকা রোগীরা ঢাকার বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয়ের পার্থক্যও উল্লেখযোগ্য। হাসপাতাল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি হাসপাতালে এনজিওগ্রামে ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা খরচ হলেও সরকারি হাসপাতালে এর খরচ ২ হাজার টাকা। রিংয়ের দাম প্রকারভেদে ৭০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত হলেও সরকারি হাসপাতালে রিং স্থাপনের খরচ ২ হাজার টাকা। বেসরকারি হাসপাতালে এ বাবদ ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত চার্জ নেওয়া হয়।

পেসমেকারের দাম দেড় লাখ থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত। বেসরকারি হাসপাতালে এটি স্থাপনে ৬০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়। সরকারি হাসপাতালে পেসমেকার স্থাপনের খরচ ২ হাজার টাকা। ফলে রমেকে স্বল্প খরচে এসব চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ থাকলেও মেশিন সংকটে সেই সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

রমেক হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক হরিপদ সরকার বলেন, ক্যাথল্যাবের একটি মেশিন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় একটি মেশিন দিয়েই পালাক্রমে চিকিৎসা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ফিলিপস কোম্পানির মাধ্যমে একটি মেশিন সচল করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ল্যাবটি সচল রাখতে কোম্পানিটির সঙ্গে কমপ্রিহেনসিভ মেইনটেন্যান্স কেয়ার (সিএমসি) চুক্তি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, সচল মেশিনটির আয়ুষ্কাল বাড়াতে রেশনিং পদ্ধতিতে রোববার, সোমবার ও মঙ্গলবার এনজিওগ্রাম এবং বুধবার ও বৃহস্পতিবার পেসমেকার ও রিং স্থাপনের কাজ করা হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলের অনেক রোগী অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল। এনজিওগ্রামে ব্লক ধরা পড়ার পর অর্থের অভাবে অনেকে রিং স্থাপন করতে পারেন না। সরকারি ব্যবস্থাপনায় রিংসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করা হলে দরিদ্র রোগীরা উপকৃত হতেন।

অধ্যাপক হরিপদ সরকার আরও বলেন, বন্ধ মেশিনটি চালু হলে হৃদরোগীদের চিকিৎসাসেবা বাড়ানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি রমেক হাসপাতালে কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগ না থাকাও একটি বড় সীমাবদ্ধতা। কোনো রোগীর পরীক্ষায় বাইপাস সার্জারির প্রয়োজন হলে তাঁকে ঢাকায় যেতে হয়। সেখানে কম খরচে কোথায় চিকিৎসা পাওয়া যাবে, সেটি নিয়েও রোগীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. আশিকুর রহমান বলেন, হাসপাতাল চত্বরে নির্মাণাধীন ১৫ তলা ৪৬০ শয্যার সমন্বিত ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগ চিকিৎসা ইউনিটের কাজ আগামী বছরের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। তখন সেখানে নতুন ক্যাথল্যাবও পাওয়া যাবে।

তিনি জানান, নতুন ক্যাথল্যাব চালু হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে স্বল্প সময়ের জন্য পুরনো ক্যাথল্যাব মেরামত অথবা নতুন ক্যাথল্যাব কেনার পেছনে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি এখন বিবেচনা করা হচ্ছে না। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে ঢাকায় জানানো হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *