বদলি বাণিজ্যের পথ বন্ধে লটারি: ১৫৫ নির্বাহী প্রকৌশলীর পদায়ন, ‘শূন্য সহনশীলতা’ ঘোষণা গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রীর

মোঃআনজার শাহ

বদলি বাণিজ্যের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ঘুচিয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এবার লটারির মাধ্যমে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়ন করা হচ্ছে। গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের জানিয়েছেন, যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য জায়গায় বসানোই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সচিবালয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে নির্বাহী প্রকৌশলীদের লটারির মাধ্যমে বদলি-পদায়ন কার্যক্রমে অংশ নেন তিনি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর, মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী, অতিরিক্ত সচিব মো. সারোয়ার আলমসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সাংবাদিকেরা।

মন্ত্রী জানান, এবার ১৫৫ জন নির্বাহী প্রকৌশলীর লটারি হচ্ছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, রাষ্ট্রপতির কার্যালয় ও সংসদ সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ তিন-চারটি জায়গা আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।
এর আগে গত ৩০ জুলাই ৭৬৭ জন এবং আগস্টে ২৫৪ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে লটারির মাধ্যমে বদলি ও পদায়ন করা হয়। গত ১৬ আগস্ট একই পদ্ধতিতে বদলি করা হয় ২১৯ জন সহকারী প্রকৌশলী ও ১৯০ জন উপবিভাগীয় প্রকৌশলীকে। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত লটারির মাধ্যমে বদলি-পদায়ন হয়েছে ১ হাজার ৪৩০ জনের।

মন্ত্রী বলেন, “মানবিক কারণে কারও বিশেষ প্রয়োজন থাকলে তিনি আবেদন করতে পারবেন। আমাদের উদ্দেশ্য কাউকে হয়রানি করা নয়; বরং সবাই যেন সমান সুযোগ পান এবং পুরো প্রক্রিয়াটি যেন মানবিক ও স্বচ্ছ হয়।”

গণপূর্ত অধিদপ্তরকে স্বচ্ছ, গতিশীল ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের প্রত্যয় জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, “আমাদের উদ্দেশ্য একটাই বদলি বাণিজ্য বন্ধ করা, সুশাসন ফিরিয়ে আনা এবং সবাইকে সমান সুযোগ দেওয়া। বিশেষ করে রূপপুর নিয়ে গণপূর্ত বিভাগের যে বদনাম হয়েছে, সেখান থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে চাই।”
তিনি জানান, অধিদপ্তরের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে; এরপর রাজউকে একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাহী প্রকৌশলীরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন বলে সিদ্ধান্ত নিতে সময় লেগেছে। মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ এবং কর্মকর্তাদের অতীত চাকরির রেকর্ড পর্যালোচনা করেই পদায়নের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রীর ভাষ্য, “এ ক্ষেত্রে কোনো আপস নেই, শূন্য সহনশীলতা নীতি অনুসরণ করা হবে।” লটারির মাধ্যমে বদলির এই পদ্ধতিকে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও শৃঙ্খলা ফেরানোর অভিনব উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভূমি ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, মন্ত্রণালয় ও অধীন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলোকে ল্যান্ড ব্যাংক তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোন জমি মন্ত্রণালয়ের, কোনটি দখলে আছে আর কোনটি বেদখল, তা চিহ্নিত করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বেদখল সরকারি জমি উদ্ধারের কাজও চলছে।
বর্তমান সরকারের মেয়াদেই যতটা সম্ভব ভূমি ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল করার চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি। আবাসন বরাদ্দে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বিষয়টি ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনা হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, এ সপ্তাহের মধ্যেই প্রকল্পটি চালু করা হবে।

পুরাতন বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় স্থানান্তরের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রায় চার মাস আগে এ কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। সচিবালয়ের এক নম্বর ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের কথা ছিল। মন্ত্রিসভার আলোচনায় সংসদ ভবন ও আগারগাঁও এলাকাকে দ্বিতীয় রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা সামনে এলে নীতিগতভাবে একটি সমীক্ষার সিদ্ধান্ত হয়।
তিনি জানান, আগামী মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিষয়টি উঠতে পারে। সেখানে নতুন সচিবালয় নির্মাণের সিদ্ধান্ত হলে দ্রুত কাজ শুরুর প্রাথমিক প্রস্তুতি রয়েছে; তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এই সরকারের মেয়াদেই কাজ শেষ করার চেষ্টা করা হবে। ধারণাগত পরিকল্পনায় প্রায় ৩০ থেকে ৩২ লাখ বর্গফুট জায়গার কথা রয়েছে।
বর্তমান সচিবালয়ের সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, জায়গা পর্যাপ্ত নয়, কয়েকটি মন্ত্রণালয় সচিবালয়ের বাইরে রয়েছে, পার্কিংয়ের জায়গাও কম। অধিকাংশ ভবন ১৯৬০-এর দশকে নির্মিত হওয়ায় সেগুলো বেশ পুরনো। বর্তমান জায়গায় থাকলেও প্রতিটি ভবন নতুন করে নির্মাণ করতে হবে।

অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর বলেন, আগে লটারির মাধ্যমে পদায়ন হয়েছে এবং তা প্রশংসিত হয়েছে। এতে মন্ত্রণালয়ের কাজে গতিশীলতা এসেছে।
আলোচনা শেষে মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের ও প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর বক্স থেকে লটারির স্লিপ তুলে কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। বদলি বাণিজ্য বন্ধ করে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও সমান সুযোগের পথে এগোনোর এই উদ্যোগ সরকারি প্রশাসনে ইতিবাচক পরিবর্তনের এক নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *