সুমন হোসেন:
বান্দরবানের লামা সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে সরকারি সংরক্ষিত বনভূমির জমি অবৈধভাবে বিক্রি, বাঁশ পাচারে সহযোগিতা, সামাজিক বনায়ন কর্মসূচিতে অনিয়ম এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া ১৫ লাখ টাকার বিনিময়ে তাঁকে লামা সদর রেঞ্জের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট অভিযোগকারীরা। একই সঙ্গে ৮০ হেক্টর এলাকায় বাগান সৃজনের বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে মাত্র ৩০ হেক্টর এলাকায় কাজ হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অবশিষ্ট ৫০ হেক্টর এলাকার বরাদ্দের অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
অভিযোগকারীদের দাবি, আব্দুল মালেক এর আগে আলীকদমের মাতামুহুরী রেঞ্জ কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছিলেন। ওই সময় সরকারি বনভূমি অবৈধভাবে হস্তান্তর বা বিক্রি, যথাযথ ইজারা ও অনুমোদন ছাড়া বাঁশ আহরণ এবং পরিবহনে সহযোগিতা এবং সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথিপত্র, আর্থিক হিসাব, অনুমোদনসংক্রান্ত কাগজপত্র এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
১৫ লাখ টাকার বিনিময়ে পদায়নের অভিযোগ
লামা সদর রেঞ্জের দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে ১৫ লাখ টাকার আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই অর্থের বিনিময়ে আব্দুল মালেককে গুরুত্বপূর্ণ এই রেঞ্জের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে কথিত লেনদেনের অর্থের উৎস, গ্রহীতা, সময় এবং এ বিষয়ে কোনো দাপ্তরিক নথি বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সরকারি দপ্তরে পদায়ন ও দায়িত্ব বণ্টন প্রশাসনিক বিধি অনুযায়ী সম্পন্ন হওয়ার কথা। সেখানে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত করা জরুরি। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না; বরং অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য গ্রহণের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন।
৮০ হেক্টর বাগান সৃজনের বরাদ্দ, কাজ হয়েছে ৩০ হেক্টরে—অভিযোগ
সামাজিক বনায়ন ও বাগান সৃজন কর্মসূচি নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ৮০ হেক্টর এলাকায় বাগান সৃজনের জন্য বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে কাজ হয়েছে মাত্র ৩০ হেক্টর এলাকায়। সে হিসাবে অবশিষ্ট ৫০ হেক্টর এলাকায় বাগান সৃজনের কাজ বাস্তবায়িত হয়েছে কি না এবং এ-সংক্রান্ত বরাদ্দের অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বনায়ন প্রকল্পের বরাদ্দের বিপরীতে নির্ধারিত এলাকায় গাছ লাগানো, চারা সংগ্রহ, পরিচর্যা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং উপকারভোগীদের সম্পৃক্ত করার মতো কার্যক্রম যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। প্রকল্পের নথিতে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তব কাজের মধ্যে পার্থক্য থাকলে তার কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।
এ ক্ষেত্রে প্রকল্পের অনুমোদিত প্রস্তাব, বরাদ্দপত্র, ব্যয়ের হিসাব, কাজের পরিমাপসংক্রান্ত প্রতিবেদন, সরেজমিন পরিদর্শনের তথ্য এবং গাছ লাগানোর স্থানগুলোর বাস্তব অবস্থা যাচাই করা প্রয়োজন। ৮০ হেক্টরের বিপরীতে ৩০ হেক্টরে কাজ হওয়ার অভিযোগ সত্য হলে অবশিষ্ট ৫০ হেক্টরের কাজ কেন সম্পন্ন হয়নি, বরাদ্দের অর্থ ব্যয় হয়ে থাকলে তা কোন খাতে ব্যয় হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের কোনো দায় রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা উচিত।
তবে প্রকল্পের বরাদ্দ ও বাস্তবায়নের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র স্বাধীনভাবে যাচাই না হওয়া পর্যন্ত অর্থ আত্মসাতের অভিযোগকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
সরকারি বনভূমি অবৈধভাবে বিক্রির অভিযোগ
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আলীকদমের মাতামুহুরী রেঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে সরকারি সংরক্ষিত বনভূমির জায়গা অবৈধভাবে হস্তান্তর ও বিক্রির সঙ্গে আব্দুল মালেকের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের দাবি, আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে সরকারি বনভূমির জায়গা ব্যক্তিপর্যায়ে বিক্রি বা ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
সরকারি সংরক্ষিত বনভূমি রাষ্ট্রীয় সম্পদ। এ ধরনের জমি সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা এবং অবৈধ দখল প্রতিরোধে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। ফলে বনভূমির মালিকানা, সীমানা, দখল, ব্যবহার এবং হস্তান্তরের বিষয়ে কোনো অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট জমির খতিয়ান ও নকশা, বন বিভাগের রেকর্ড, জমির শ্রেণি, দখলসংক্রান্ত তথ্য, অনুমোদিত বন্দোবস্ত বা ব্যবহারের কাগজপত্র এবং কথিত আর্থিক লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনা করা জরুরি। পাশাপাশি ওই জমিতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দখল প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকলে তার বৈধতা যাচাইয়েরও দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
বাঁশ আহরণ ও পরিবহনে অনিয়মের অভিযোগ
মাতামুহুরী রেঞ্জ এলাকায় যথাযথ ইজারা ও অনুমোদন ছাড়া বাঁশ আহরণ এবং পরিবহনের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করা হয়ে থাকলে সরকারি বনজ সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সরকার রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হতে পারে।
বনজ সম্পদ আহরণ ও পরিবহনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধি, অনুমোদন, ইজারার শর্ত এবং রাজস্ব পরিশোধের বিষয়গুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সময়ের ইজারার নথি, অনুমতিপত্র, পরিবহনসংক্রান্ত কাগজপত্র, রাজস্ব আদায়ের হিসাব এবং জব্দ বা অভিযানের কোনো রেকর্ড থাকলে সেগুলো পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
অভিযোগকারীদের মতে, সরকারি বনজ সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে বৈধভাবে আহরণ করা বাঁশের পরিমাণ, পরিবহনের অনুমোদন এবং সরকারের প্রাপ্য রাজস্বের হিসাবের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা জরুরি।
সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির অর্থ ও উপকারভোগীদের নিয়ে প্রশ্ন
সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, বাগান সৃজন, চারা রোপণ, পরিচর্যা, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রকল্পের ব্যয় এবং উপকারভোগীদের অধিকারসংক্রান্ত কার্যক্রমে অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে।
সামাজিক বনায়নের মূল লক্ষ্য হলো বনসম্পদ বৃদ্ধি, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে আর্থসামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখা। এ ধরনের প্রকল্পে নির্ধারিত কাজ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হলে একদিকে পরিবেশগত লক্ষ্য ব্যাহত হতে পারে, অন্যদিকে প্রকৃত উপকারভোগীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
এ কারণে প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দ, অর্থ ছাড়, ব্যয়ের ভাউচার, চারা সংগ্রহ ও বিতরণের হিসাব, রোপণ করা গাছের সংখ্যা, বাগানের বাস্তব অবস্থা এবং উপকারভোগীদের তালিকা যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা এবং তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমও পর্যালোচনা করা উচিত।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
বর্তমানে আব্দুল মালেক লামা সদর রেঞ্জে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর আগের কর্মস্থল মাতামুহুরী রেঞ্জে দায়িত্ব পালনকালীন উত্থাপিত অভিযোগ এবং বর্তমান কর্মস্থলে পদায়নসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
তাঁদের দাবি, সরকারি বনভূমি হস্তান্তর বা ব্যবহারের অনুমোদন, বাঁশের ইজারা, বনজ সম্পদ পরিবহন, সামাজিক বনায়ন প্রকল্পের বরাদ্দ ও ব্যয়ের হিসাব এবং বাগান সৃজনের বাস্তব অগ্রগতি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি ৮০ হেক্টরের বিপরীতে ৩০ হেক্টর এলাকায় কাজ হওয়ার অভিযোগের সত্যতা সরেজমিনে পরিমাপের মাধ্যমে যাচাই করা হলে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রকৃত চিত্র উঠে আসতে পারে।
অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। একই সঙ্গে তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা না মিললে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়েও স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য
এসব অভিযোগের বিষয়ে রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল মালেক নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেছেন। তাঁর দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো সত্য নয়। তবে অভিযোগের প্রতিটি বিষয়ে তাঁর সুনির্দিষ্ট বক্তব্য, ১৫ লাখ টাকার বিনিময়ে পদায়নের অভিযোগের ব্যাখ্যা এবং ৮০ হেক্টর বাগান সৃজনের বরাদ্দের বিপরীতে বাস্তবে কতটুকু কাজ হয়েছে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং কোনো তদন্ত বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া গেলে প্রতিবেদনে তা যুক্ত করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ ও সরকারি নথিপত্র পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।