মোঃআনজার শাহ
৭ নভেম্বর: স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর এক তাৎপর্যপূর্ণ ও বহুল আলোচিত অধ্যায়। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সংঘটিত সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক, সামরিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের সূচনা করেছিল। দিনটি ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ নামে পরিচিত।
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের সামনে ছিল পুনর্গঠনের কঠিন চ্যালেঞ্জ। অর্থনৈতিক সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রশ্ন তখন একসঙ্গে দেশকে চাপে রেখেছিল। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এমন অস্থির পটভূমিতেই ১৯৭৫ সালের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতার দ্রুত পালাবদল ঘটে।
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান গৃহবন্দী হন। এরপর ৬ নভেম্বরের রাত পেরিয়ে ৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে ঢাকা সেনানিবাসে সিপাহিদের অভ্যুত্থান শুরু হয়। সাধারণ মানুষের একটি অংশও এতে যুক্ত হয়।
এই অভ্যুত্থানের ফলে জিয়াউর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্তি পান। পরবর্তী সময়ে তিনি দেশের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় আসেন এবং শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনেন।
৭ নভেম্বর কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনার স্মারক নয়। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তন, ক্ষমতার পালাবদল এবং জাতীয় সংকট মোকাবিলার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। সিপাহি ও সাধারণ জনতার সম্মিলিত অংশগ্রহণ এ দিনের ঘটনাপ্রবাহকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।
এই দিনের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়, রাষ্ট্রের অগ্রগতির জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সাংবিধানিক শাসন, দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান ও সুশৃঙ্খল সশস্ত্র বাহিনী অপরিহার্য। একই সঙ্গে বিভেদ ও সংঘাতের পরিবর্তে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও জাতীয় ঐক্যের চর্চা আজ সময়ের দাবি।
অতীতের রাজনৈতিক সংঘাত, সামরিক অভ্যুত্থান ও প্রাণহানির ঘটনা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয়। এসব ঘটনা গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার গুরুত্ব নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।
ইতিহাসকে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে রেখে তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মানুষের মৌলিক অধিকার সুরক্ষার মধ্য দিয়েই একটি শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসের এক ঘটনাবহুল ও নির্ণায়ক দিন। এ দিনের ঘটনাপ্রবাহ দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসে গভীর ছাপ রেখে গেছে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে জাতীয় ঐক্য, গণতন্ত্র, মানবিক মূল্যবোধ, আইনের শাসন ও দেশপ্রেমের ভিত্তিতে এগিয়ে চলাই হোক এই দিনের প্রকৃত শিক্ষা।