কামরুল ইসলাম:
চট্টগ্রাম নগরীর ইপিজেড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমানের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, কথিত ক্যাশিয়ারের মাধ্যমে অবৈধ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসোহারা আদায়, পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি এবং বদলির আদেশ বাস্তবায়নে অনীহাসহ বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগকে মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন অপপ্রচার বলে দাবি করেছেন তাঁর পক্ষে বক্তব্য দেওয়া ব্যক্তিরা।
কামরুল ইসলামের দাবি, একটি ষড়যন্ত্রকারী মহল ওসি আতিকুর রহমানের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এসব অভিযোগ প্রচার করছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিভাগের সাংবাদিক পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগগুলোর বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক গণমাধ্যমকর্মী ও স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের দাবি, একটি চক্র বিভিন্ন থানার ওসিদের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করে। প্রত্যাশিত সুবিধা না পেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ প্রচার করে। তাঁদের দাবি, ইপিজেড থানায় যোগদানের পর ওসি আতিকুর রহমানের কাছেও ওই চক্র বিভিন্ন বিষয়ে তদবির করেছিল। তবে বেআইনি সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, ওসি আতিকুর রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর ইপিজেড থানা এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। সিমেন্ট ক্রসিং, বন্দরটিলা, ব্যারিস্টার কলেজ, মাইলের মাথা, সি-ম্যাস হোস্টেল ও সল্টগোলা এলাকায় সন্ত্রাস, মাদক এবং কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা আগের তুলনায় কমেছে বলে তাঁদের বক্তব্য।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, বিমানবন্দর সড়ক ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে রাতে মোবাইল ফোন ছিনতাই ও চুরির ঘটনা কমেছে। বিভিন্ন এলাকায় রাতের আঁধারে বৈদ্যুতিক কেবল চুরির ঘটনাও আগের তুলনায় কমেছে বলে দাবি করেছেন তাঁরা।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, ব্যারিস্টার কলেজ থেকে মাইলের মাথা পর্যন্ত সড়কের পূর্ব পাশে সকাল ৭টা থেকে ১১টা এবং বিকেল ৩টার দিকে ১০ থেকে ১২ জনের একটি চক্র তিন তাসের আসর বসাত। ওসি আতিকুর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশের অভিযানের কারণে ওই আসর বন্ধ হয়েছে বলে তাঁদের দাবি। একই সঙ্গে সাধারণ পথচারী ও পোশাকশ্রমিকদের কাছ থেকে কৌশলে মোবাইল ফোন ও টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাও কমেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
আবাসিক এলাকায় মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়েও আগে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ ছিল বলে জানা গেছে। ব্যারিস্টার কলেজের প্রধান সড়কসংলগ্ন এস এ পরিবহনের পাঁচতলা ফরিদা ম্যানশন এবং পাশের গলিতে ইয়াবা ও গাঁজার কারবার চলার অভিযোগও ছিল। তবে স্থানীয়দের দাবি, পুলিশের তৎপরতায় এসব কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়েছে। একইভাবে আবাসিক ভবন ও বাসাবাড়ির পানির মোটর, বৈদ্যুতিক তার এবং বিভিন্ন সরঞ্জাম চুরির ঘটনাও বর্তমানে কমেছে বলে তাঁদের বক্তব্য।
জুট ব্যবসায়ী ও অবৈধ কারবারিদের কাছ থেকে মাসোহারা আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, দুই ইপিজেড এলাকার জুট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আগে প্রতি মাসে আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা আদায় করা হতো। ওসি আতিকুর রহমান যোগদানের পর এ ধরনের অর্থ আদায় বন্ধ হয়েছে বলে তাঁরা দাবি করেন। পাশাপাশি আকমল আলী বেড়িবাঁধ এলাকায় অবৈধ পণ্য ও কালো তেল পাচারের সঙ্গে জড়িত কারবারিদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগও বর্তমানে বন্ধ রয়েছে বলে তাঁদের বক্তব্য।
কথিত ক্যাশিয়ারের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগও অস্বীকার করেছেন ওসির পক্ষের ব্যক্তিরা। তাঁদের দাবি, এ ধরনের কোনো অর্থ আদায়ের ঘটনা নেই। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ইপিজেড থানা এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি চুরির ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেছেন, তাঁদের বক্তব্য না নিয়েই এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। চৌধুরী মার্কেটের সামনে ক্ষুদ্র চা-দোকানি সাইফুলের দোকান থেকে লক্ষাধিক টাকার মালামাল চুরির অভিযোগের বিষয়ে সাইফুলের বক্তব্য, লক্ষাধিক টাকার মালামাল চুরি হয়নি; রাতের অন্ধকারে কিছু মালামাল চুরি হয়েছে।
ওসি আতিকুর রহমান যোগদানের পর থানার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বণ্টন, ডিউটি এবং সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে নিজ জেলা কুমিল্লার কয়েকজন কর্মকর্তাকে বিশেষ প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগও আলোচনায় এসেছে। তবে থানায় কর্মরত কয়েকজনের দাবি, এ বিষয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তাঁর প্রতি অসন্তোষ নেই। তাঁরা বিষয়টিকে থানার অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সব মিলিয়ে ওসি আতিকুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে একদিকে অভিযোগকারীদের বক্তব্য, অন্যদিকে তাঁর পক্ষে স্থানীয়দের দাবি—দুই ধরনের বক্তব্য পাওয়া গেছে। অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।