এ আর সুমন:
কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে ট্রলার চলাচলকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে এক শিক্ষকের ওপর প্রকাশ্যে হামলার ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। হামলার শিকার শিক্ষক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনের অভিযোগ, হামলার সময় অষ্টগ্রাম থানার এসআই শফিক ও তাঁর সঙ্গে থাকা পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও তাঁকে রক্ষায় এগিয়ে আসেননি। বরং তাঁরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে ঘটনার ভিডিও ধারণ করেন। পরে লোক মারফত পুলিশের ধারণ করা সেই ভিডিও সংগ্রহ করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই শফিক বলেন, “অনেক দিন আগের ঘটনা, আমার সঠিক মনে নেই।”
অন্যদিকে, একই বিরোধের ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে অষ্টগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রোকনুজ্জামানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অভিযোগ ও ভিডিও ফুটেজ জমা দেওয়ার পরও মামলা গ্রহণ না করা, অভিযুক্তদের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ এবং মাদক কারবারিদের সঙ্গে কথিত সখ্যতাসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মো. আলাউদ্দিন (৪৫)। থানা থেকে পুলিশ সুপার ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করার পরও প্রতিকার না পেয়ে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বরাবর লিখিত আবেদন করেছেন তিনি।
আলাউদ্দিনের দাবি, আইজিপির দপ্তরের নির্দেশনার পর অষ্টগ্রাম থানা থেকে নোটিশ পেয়ে নির্ধারিত দিনে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে হাজির হয়ে অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ ও প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু এরপরও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো প্রতিকার পাননি। এ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা, অভিযোগ গ্রহণ এবং নিরপেক্ষ তদন্তের বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
হামলার শিকার মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন সাভিয়ানগর আবদুল আউয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিষয়ের সিনিয়র শিক্ষক। তিনি বলেন, তাঁর ওপর হামলার সময় এসআই শফিক ও তাঁর সঙ্গে থাকা পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। হামলাকারীরা আক্রমণ চালালে তিনি পুলিশের কাছে সাহায্য চান এবং তাঁকে রক্ষার জন্য বারবার অনুরোধ করেন। কিন্তু পুলিশ সদস্যরা এগিয়ে না এসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে হামলার দৃশ্য ধারণ করতে থাকেন বলে অভিযোগ তাঁর।
নাসির উদ্দিন আরও বলেন, পরবর্তী সময়ে লোক মারফত পুলিশের ধারণ করা সেই ভিডিও সংগ্রহ করেন তিনি। পুলিশের উপস্থিতিতে একজন শিক্ষকের ওপর প্রকাশ্যে হামলার ঘটনা ঘটলেও তাঁকে রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা না নেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।
এ বিষয়ে অষ্টগ্রাম থানার এসআই শফিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “অনেক দিন আগের ঘটনা, আমার সঠিক মনে নেই।”
আলাউদ্দিনের অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১০ জুলাই ২০২৬ তারিখে অষ্টগ্রাম থেকে বাজিতপুরের গয়না ঘাট পর্যন্ত ট্রলার চলাচলকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে তাঁর বড় ভাই মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে তিনি আহত হন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আলাউদ্দিনের দাবি, বিরোধের একপর্যায়ে প্রতিপক্ষের লোকজন পিস্তলসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন অস্ত্র প্রদর্শন করে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন। এ সময় ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত থাকলেও অস্ত্র উদ্ধার কিংবা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাঁর অভিযোগ, পুলিশের সদস্যরা অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা না নিয়ে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণে ব্যস্ত ছিলেন। পুলিশের সামনে অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা ঘটলেও তাৎক্ষণিকভাবে অস্ত্র উদ্ধার ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
অষ্টগ্রাম থানার ওসি রোকনুজ্জামানের বিরুদ্ধে আলাউদ্দিনের আরও অভিযোগ, ব্যক্তিস্বার্থে ক্ষমতার অপব্যবহার, অপরাধীদের সহায়তা, অভিযোগ ও ভিডিও ফুটেজ জমা দেওয়ার পরও মামলা গ্রহণ না করা এবং মাদক কারবারিদের সঙ্গে কথিত সখ্যতাসহ নানা অনিয়মের ঘটনা ঘটছে। তাঁর দাবি, এসব কারণে অষ্টগ্রাম এলাকায় অপরাধ ও মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ঘটনার প্রতিকার চেয়ে গত ১০ সেপ্টেম্বর অষ্টগ্রাম থানার ওসি বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন আলাউদ্দিন। তাঁর দাবি, অভিযোগ করার পরও কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরে পুলিশ সুপারসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেও প্রতিকার না পেয়ে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন তিনি।
আলাউদ্দিনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক স্মারকের সূত্র উল্লেখ করে গত ১৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে অষ্টগ্রাম থানা থেকে একটি নোটিশ জারি করা হয়। নোটিশে অভিযোগের অনুসন্ধান ও তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং জাতীয় পরিচয়পত্রসহ ১৭ অক্টোবর সকাল ১০টায় অষ্টগ্রাম সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. দিদারুল ইসলামের কাছে হাজির হতে বলা হয়।
আলাউদ্দিনের দাবি, তিনি নির্ধারিত সময়ে হাজির হয়ে অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ ও প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করেন। কিন্তু এরপরও দৃশ্যমান কোনো প্রতিকার পাননি। তিনি জানান, অভিযুক্তদের কথিত হুমকি, অস্ত্র প্রদর্শন ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের অডিও-ভিডিও প্রমাণ তাঁর কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংবাদপত্রের কাটিংসহ প্রাসঙ্গিক তথ্য-প্রমাণও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে অষ্টগ্রাম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রোকনুজ্জামানের কাছে জানতে চাইলে তিনি দৈনিক স্বাধীন সংবাদকে বলেন, “মামলা নেয়নি কথাটা ভুল। অভিযোগে কিছু অসংগতি প্রসঙ্গ এনেছে, যা ভুল। আমি বলেছিলাম, আজ এ অভিযোগটি সংশোধন করে নিয়ে আসেন। কিন্তু তারা আর আসেনি।”
অন্যদিকে, নোটিশ ও তদন্তের বিষয়ে ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. দিদারুল ইসলামের কাছে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এই বিষয়ে বিভাগীয় তদন্ত চলছে। এখন আপাতত কোনো কিছু বলা যাচ্ছে না।”
একজন শিক্ষকের ওপর প্রকাশ্যে হামলার সময় পুলিশের উপস্থিতি এবং আক্রান্ত ব্যক্তির সাহায্যের আবেদন সত্ত্বেও পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা নিয়ে ওঠা প্রশ্ন শিক্ষক সমাজ ও সচেতন মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে পুলিশের সামনে হামলার ঘটনা, হামলার সময় ভিডিও ধারণ এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে সহায়তা না করার অভিযোগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যের ‘ঘটনাটি সঠিক মনে নেই’ বক্তব্য নানা প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। বিশেষ করে দায়িত্ব পালনরত পুলিশের উপস্থিতিতে অস্ত্র প্রদর্শন, অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া, অভিযোগ গ্রহণে গড়িমসি এবং মাদক কারবারিদের সঙ্গে কথিত সখ্যতার অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি অভিযোগগুলো উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই। পুলিশের ভাবমূর্তি ও সাধারণ মানুষের আস্থা ধরে রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা সম্পর্কে পরিষ্কার ব্যাখ্যা এবং নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
বর্তমানে ভুক্তভোগী আলাউদ্দিন ও স্থানীয়দের প্রত্যাশা, পুলিশ সদর দপ্তর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি শিক্ষক নাসির উদ্দিন ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
একই সঙ্গে পুলিশের উপস্থিতিতে একজন শিক্ষকের ওপর হামলার ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা কী ছিল, কেন তাঁকে তাৎক্ষণিক সহায়তা করা হয়নি এবং অভিযোগের পরও কেন কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার মিলছে না—এসব প্রশ্নের যথাযথ জবাব চান ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল।