আপনাদের ভোটেই সংসদে গেছি, তাই জবাবদিহির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে এসেছি: বরুড়ায় গৃহায়নমন্ত্রী

মোঃ আনজার শাহ

জনপ্রতিনিধির আসন মানেই আসামির কাঠগড়া। যাঁদের ভোটে সংসদে গেছি, তাঁদের কাছে জবাব দেওয়াই আমার প্রথম দায়িত্ব। কুমিল্লার বরুড়ায় স্থানীয় এক আলোচনা সভায় এমন আবেগঘন বক্তব্য রাখেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন। মন্ত্রণালয়ের ব্যস্ততার মধ্যেও এলাকায় ফিরে আসার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, এটাই তাঁর নৈতিক দায়বদ্ধতা।
বক্তব্যের শুরুতেই মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তাঁর ওপর আস্থা রেখে দায়িত্ব দিয়েছেন, সে জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে কৃতজ্ঞ। তবে সবার আগে কৃতজ্ঞ এলাকার মানুষের কাছে, যাঁরা তাঁর ওপর ভরসা রেখেছেন। তাঁর ভাষ্য, এই সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত; তাই সরকারের প্রতিটি কাজ হবে জনগণের জন্য, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে বড়লোক বানানোর জন্য নয়।

নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে মন্ত্রী জানান, গরিব মা-বোনদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড এবং ইমামদের সম্মানী ভাতার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাইলট প্রকল্প হিসেবে কিছু এলাকায় কৃষক কার্ড দেওয়া হয়েছে। আগামী ডিসেম্বর-জানুয়ারির মধ্যে সব কার্ডের বিতরণ পুরোদমে শুরু হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

পাঁচ বছর পর আবার জনগণের সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিশ্রুতি পূরণের হিসাব দিতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগের সরকারের মতো রাতের অন্ধকারে ভোট করে নয়, জনগণের ভালোবাসা ও বিশ্বাস নিয়েই ক্ষমতায় থাকতে চায় বর্তমান সরকার। প্রধানমন্ত্রীর কর্মব্যস্ততার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সকাল আটটা থেকে কাজ শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী। সাম্প্রতিক বিদেশ সফরে সীমিত সদস্য নিয়ে তিনি পাঁচ দিনে বহু বৈঠক করেছেন।

গত সাত মাসের কাজের প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, আগের সরকারের রেখে যাওয়া ‘আবর্জনা’ পরিষ্কার করতেই বাড়তি সময় ও শ্রম যাচ্ছে। তাঁর দাবি, দেশ থেকে প্রায় ছয় লাখ কোটি টাকা বেরিয়ে গেছে এবং সরকারের কোষাগার ছিল প্রায় শূন্য।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি-সংকট এবং জিনিসপত্রের দামের চাপে জনদুর্ভোগের কথা স্বীকার করে মন্ত্রী বলেন, ইরান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও এলএনজির দাম বহুগুণ বেড়েছে, যা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তিনি বলেন, ‘এ যুদ্ধ চিরদিন চলবে না।’ সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি দোয়া চান।

‘সাত মাসে কোনো কাজ দেখা যায়নি’ এমন সমালোচনার জবাবে মন্ত্রী বলেন, প্রতিটি ওয়ার্ডে ছোট ছোট সড়কের কাজ হয়েছে। বরুড়ার প্রায় ৭০০ কিলোমিটার সড়কের আইডি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার রাস্তার অবস্থা খারাপ, তাই আগে রক্ষণাবেক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে শুকনো মৌসুমে প্রতিটি ইউনিয়নে বড় পরিসরে উন্নয়নকাজ শুরু হবে।
তিনি আরও জানান, কয়েক দিনের মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ২৪ ফুট প্রশস্ত করার দরপত্র হবে, যাতে পাশাপাশি দুটি বড় গাড়ি চলতে পারে। এ ছাড়া নতুন থানা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। উপজেলা পরিষদ চত্বর নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে, নতুন ভবন ও অডিটোরিয়াম হবে এবং একটি স্কুলও সংস্কার করা হচ্ছে। প্রতিটি খাল পুনঃখননের প্রকল্প জমা দেওয়া হয়েছে। খননের মাটি দিয়ে নতুন সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

পৌরসভার জন্য প্রায় ১০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী। এর আওতায় পৌরসভার রিং রোড নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

যুবকদের দক্ষ করে বিদেশে পাঠানোর স্বপ্নের কথা শোনান মন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, দক্ষতা ও ভাষাজ্ঞান ছাড়া বিদেশে গেলে কম আয়ে কষ্ট করতে হয়, অথচ ছয় মাস কাজ শিখে গেলে আয় কয়েক গুণ বাড়ে। এ লক্ষ্যে বরুড়ায় টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (টিটিসি) গড়া হচ্ছে। এর জন্য জমি নির্ধারণ হয়েছে এবং আগামী বছরের মধ্যে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হবে।
জাপানে পাঠানোর একটি সুযোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিটি গ্রাম থেকে আট-দশজন করে যুবককে পাঠানোর ইচ্ছা তাঁর। এ ক্ষেত্রে এন৫ ও এন৪ স্তরের জাপানি ভাষা শিখতে হবে। খরচের একটি অংশ আগাম বহনের উদ্যোগের কথাও তিনি জানান। তাঁর মতে, প্রতিটি পরিবারে একজন বিদেশে আয় করলে পাঁচ বছরের মধ্যে গ্রামের চেহারা বদলে যাবে।

আর্সেনিক ও আয়রনে আক্রান্ত পানির সংকট নিরসনে মেঘনা নদী থেকে কুমিল্লায় পানি সরবরাহের একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। তাঁর আশা, পাইপলাইনের মাধ্যমে ওই পানি পৌরসভা ও আশপাশের এলাকায় পৌঁছাবে। পাশাপাশি বরুড়া উপজেলার জন্য প্রায় দুই হাজার নতুন নলকূপ বসানোর উদ্যোগের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিটি গ্রামে অন্তত চার-পাঁচটি নলকূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে মানুষ নিরাপদ ও সুস্বাদু পানি পান করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *