মোঃআনজার শাহ
ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সম্ভাবনার শহর কুমিল্লাকে পরিকল্পিত, আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরে রূপ দেওয়ার পথে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ নিয়ন্ত্রণ, ভূমির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা, নিয়মবহির্ভূত ভবন নির্মাণ বন্ধ এবং নাগরিক জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে কার্যক্রম শুরু করেছে কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কুউক)।
কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২৬ অনুযায়ী গঠিত এ কর্তৃপক্ষের আওতায় রয়েছে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন এলাকা এবং সরকারি গেজেটে নির্ধারিত সংলগ্ন এলাকা। ১০ এপ্রিল ২০২৬ প্রণীত এই আইনের লক্ষ্য একটি পরিকল্পিত আধুনিক নগর প্রতিষ্ঠা, পরিবেশ ও প্রতিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, দুর্যোগ সহনশীল নগর ব্যবস্থাপনা এবং উন্নত নাগরিক জীবন নিশ্চিত করা।
আইনের বিধান অনুযায়ী, অপরিকল্পিত উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ এবং বিধিবিধান ও কোড অনুসরণ করে ইমারত নির্মাণের অনুমোদন ও তদারকি কর্তৃপক্ষের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ, অবৈধ, অননুমোদিত কিংবা অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘনকারী স্থাপনা অপসারণ এবং ভূমি ব্যবহারে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ আরোপের ক্ষমতাও তাদের দেওয়া হয়েছে।
নগরায়ণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো সঠিক পরিকল্পনা ও অনুমোদিত নকশার যথাযথ বাস্তবায়ন। নতুন আইনের আওতায় কর্তৃপক্ষ ভবন নির্মাণের অনুমোদন ও তদারকির পাশাপাশি নগর পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উন্নয়নকাজ পরিচালনা করবে।
ফলে সড়কের প্রস্থ, ভবনের অবস্থান, উন্মুক্ত স্থান, জলাধার, পার্কিং, পরিবেশ ও নাগরিক চলাচলের মতো বিষয় উপেক্ষা করে ভবন নির্মাণের সুযোগ সংকুচিত হবে। অনুমোদিত নকশার বাইরে স্থাপনা নির্মাণ বা নগর পরিকল্পনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক উন্নয়নকাজের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব কেবল নকশা অনুমোদনেই সীমাবদ্ধ নয়। আইনে ভূমির যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করে মহাপরিকল্পনা, কৌশলগত পরিকল্পনা ও বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে।
আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকার সুষ্ঠু বিন্যাস, সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা, পানি সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাশয় ও কৃষিজমি সংরক্ষণ, উদ্যান, খেলার মাঠ ও হাসপাতালের মতো নাগরিক সুবিধার জন্য ভূমি সংরক্ষণও মহাপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করার বিধান রয়েছে। অর্থাৎ, কুমিল্লার ভবিষ্যৎ নগরায়ণকে কেবল ইট-কংক্রিটের সম্প্রসারণ হিসেবে নয়, বরং পরিবেশ, যোগাযোগ, নাগরিক সুবিধা ও জনজীবনের ভারসাম্যের সঙ্গে সমন্বিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নগর ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহারও আইনে গুরুত্ব পেয়েছে। কর্তৃপক্ষের সেবা ডিজিটালাইজেশনের দায়িত্ব আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। ফলে ভবিষ্যতে নকশা অনুমোদনসহ বিভিন্ন সেবা অনলাইনভিত্তিক ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার আওতায় আসার পথ তৈরি হয়েছে। এতে আবেদন গ্রহণ, নথি যাচাই ও অনুমোদনপ্রক্রিয়ায় নাগরিক হয়রানি কমবে এবং জবাবদিহি বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নগর পরিকল্পনার বিধি না মেনে নির্মাণকাজ চালালে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। অননুমোদিত ও নকশা লঙ্ঘনকারী স্থাপনা শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনে অপসারণের ব্যবস্থাও কর্তৃপক্ষের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
সম্প্রতি কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. উদবাতুল বারী আবুর নেতৃত্বে বিভিন্ন স্থাপনা ও নির্মাণকাজ তদারকির বিষয়টি সামনে এসেছে। এতে সড়ক বা চলাচলের পথ, প্রয়োজনীয় সেটব্যাক ও পার্কিংসহ অনুমোদিত নকশা ও বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কুমিল্লায় বাড়ছে আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা। কিন্তু পরিকল্পনাহীনভাবে ভবন ও অবকাঠামো গড়ে উঠলে যানজট, জলাবদ্ধতা, অগ্নিঝুঁকি, অপর্যাপ্ত পার্কিং, সংকুচিত সড়ক এবং নাগরিক সেবার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
এই বাস্তবতায় কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমকে নগরটির ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, নির্মাণে শৃঙ্খলা, পরিবেশ ও জলাধার সংরক্ষণ, নাগরিক সুবিধার সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা নিশ্চিত করা গেলে কুমিল্লা আরও পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য নগরে রূপ নেওয়ার সুযোগ পাবে। আইন অনুযায়ী কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত সভা করে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে এবং প্রয়োজনে বিভিন্ন কমিটি গঠন করে সহায়তা নেওয়ার সুযোগও রয়েছে।
কুমিল্লার নগরজীবনে তাই নতুন প্রত্যাশা উন্নয়ন হবে, তবে পরিকল্পনার ছকে; ভবন উঠবে, তবে নিরাপত্তা ও বিধিমালা মেনে; নগর বাড়বে, তবে পরিবেশ ও নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্যকে সঙ্গে নিয়েই।