আমিনুল ইসলাম মুকুল:
কুড়িগ্রাম জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, বদলি বাণিজ্য ও অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মনগড়া বলে দাবি করেছেন উপপরিচালক মোজাম্মেল হক।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ২১ জুন কুড়িগ্রাম মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র পরিদর্শনে যান জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোজাম্মেল হক। এ সময় কেন্দ্রের পরিদর্শিকা শাহিনা খাতুন ও প্রতিমা রানী সরকারকে মেডিকেল অফিসারের কক্ষে ডেকে নিয়ে পরিত্যক্ত সরকারি বাসায় বসবাস না করার কারণে তাঁদের বেতন থেকে বাসাভাড়া কর্তনসহ বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধমকি দেন বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।
পরবর্তীতে উপপরিচালক মোজাম্মেল হক তাঁর ব্যাচমেট ও বন্ধু হিসেবে পরিচিত পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের রংপুর বিভাগীয় পরিচালককে কুড়িগ্রামে নিয়ে আসেন। তাঁর মাধ্যমে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বাসাভাড়া এবং ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিল বকেয়া হিসেবে কর্তনের চিঠি করানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া জুন মাস থেকে অদ্যাবধি তাঁদের বেতন থেকে চলমান বাসাভাড়া ও বিদ্যুৎ বিল কর্তন করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।
অথচ ২০২৩ সালে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হক এবং তৎকালীন কুড়িগ্রাম জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোদাব্বের হোসেন কুড়িগ্রাম জেলা সদরের মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের অফিসার্স কোয়ার্টার এবং পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকাদের কোয়ার্টার বসবাসের অনুপযোগী ঘোষণা করে প্রত্যয়নপত্র দিয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী শাহিনা খাতুন ও প্রতিমা রানী সরকার পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের রংপুর বিভাগীয় পরিচালক এবং মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। তাঁদের অভিযোগ, উপপরিচালক মোজাম্মেল হক তাঁর পছন্দের খুলনা বিভাগের একজন উপপরিচালককে নিয়ে এসে তদন্ত করান। তবে তদন্তের সময় ভুক্তভোগীদের ডাকা হয়নি। তাঁদের দাবি, তাঁদের বক্তব্য না নিয়েই তড়িঘড়ি করে একতরফাভাবে তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, তদন্তের সময় কুড়িগ্রাম সদর মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের আয়া মোছা. নুরুননাহার বেগম ও মিনা রানী সরকার সাক্ষ্য দিতে গেলে তাঁদের বক্তব্য গ্রহণ করা হয়নি। বরং পরবর্তীতে নুরুননাহার বেগমকে ঘোগাদহ এবং মিনা রানী সরকারকে যাত্রাপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে বদলি করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ছাড়া উপপরিচালক মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে নিজস্ব সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মাহবুবার রহমান মীমের মাধ্যমে বদলি ও নিয়োগসংক্রান্ত বাণিজ্যসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক ফাইলের কাজ পরিচালনা করা হয়। অথচ মাহবুবার রহমান মীমকে প্রেষণে আনার মূল উদ্দেশ্য ছিল পরিসংখ্যান সহকারীর দায়িত্ব পালন করা। অভিযোগ রয়েছে, এ পদে পরপর দুজন পরিসংখ্যান সহকারী যোগদান করলেও তাঁদের দীর্ঘদিন দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। পরে তাঁরা বদলি নিয়ে চলে যান। বর্তমানে নাজমুল ইসলাম নামে একজন পরিসংখ্যান সহকারী কর্মরত থাকলেও তাঁকেও এখন পর্যন্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগী পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা প্রতিমা রানী সরকার অভিযোগ করে বলেন, উপপরিচালক তাঁকে অফিসকক্ষে ডেকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করেন। এমনকি তাঁর স্বামী, সন্তান ও সিঁদুরের কসম দিয়েও কথা বলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা শাহিনা খাতুনের অভিযোগ, উপপরিচালক তাঁর নিজের হাতে লেখা একটি স্বীকারোক্তিমূলক কাগজ দিয়ে সেটি হুবহু লিখে দিতে বলেন। ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদর্শনের মাধ্যমে তাঁদের কাছ থেকে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি লিখিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁদের অভিযোগ, এত কিছুর পরও চার সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটির সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে তাঁদের পরিত্যক্ত বাসায় বসবাসের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, কুড়িগ্রাম জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ে যোগদানের পর থেকে উপজেলা ও মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনে গিয়ে অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে মুরগির মাংস, মাছ, গাভির দুধসহ বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে উপপরিচালক মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশে তিনি ‘আমি যা বলব, সেটাই সঠিক। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালকরা আমার ব্যাচমেট ও বন্ধু। আমার কিছুই কেউ করতে পারবে না’—এমন কথাও বলতেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, তাঁর কথায় রাজি না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলি করা হতো। পরে তাঁরা যোগাযোগ করলে মোটা অঙ্কের উপঢৌকনের বিনিময়ে পছন্দের স্থানে বদলি করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছ থেকে সংগ্রহ করা মাছ ও মাংস অফিসের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে রান্না করে ভোজের আয়োজন করা হতো বলেও অভিযোগ উঠেছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, উপপরিচালক মোজাম্মেল হক সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে নিজের বাসা রংপুরে যাতায়াতসহ ব্যক্তিগত বিভিন্ন কাজে গাড়িটি ব্যবহার করেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কুড়িগ্রাম জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোজাম্মেল হক বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মনগড়া।
অন্যদিকে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জিন্নাত রেহেনা বলেন, অভিযোগগুলো দ্রুত তদন্ত করে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।