মোঃআনজার শাহ:-
ভোরের কুয়াশা তখনো পুরোপুরি কাটেনি। তবু বরুড়ার আনাচে-কানাচের পথঘাট তখন থেকেই সরগরম। পায়ে হেঁটে, ভ্যানে চেপে, রিকশায় দুলতে দুলতে দলে দলে মানুষ এগিয়ে চলেছেন এক গন্তব্যে। কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার ঝলম উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ প্রাঙ্গণ। কারণ আজ এখানে ডাক্তার আসবেন। বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। আর একটি পয়সাও লাগবে না।
যে বৃদ্ধ বুকের ব্যথা বুকে চেপে বছরের পর বছর পার করে দিয়েছেন, যে তরুণ মা সন্তানের অসুখ নিয়ে রাতের পর রাত কেঁদেছেন কিন্তু টাকার অভাবে শহরের হাসপাতালে যেতে পারেননি আজ ৩০ মে তাঁদের জন্যই দরজা খুলে দিয়েছে এ কে এম আবু তাহের ফাউন্ডেশন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাৎ বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত *’ফ্রি হেলথ ক্যাম্প বরুড়া-২০২৬’* হয়ে উঠেছে বরুড়ার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় মানবিক অধ্যায়।
মাটিতে গাছ, বুকে মানুষের স্বপ্ন,
ক্যাম্পের উদ্বোধনী মুহূর্তটি ছিল এক আলাদা আবেগের। গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন ঝলম কলেজ মাঠের এক প্রান্তে নিজ হাতে একটি কাঁঠালগাছের চারা মাটিতে পুঁতে দেন। সেই একটি চারা রোপণের মধ্য দিয়ে তিনি নেতাকর্মীদের প্রতি বাকি আড়াই হাজার গাছ লাগানোর উদাত্ত আহ্বান জানান।
একটি গাছ যা একদিন ছায়া দেবে, ফল দেবে, প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আশ্রয় দেবে। আর এই ফাউন্ডেশনও ঠিক তেমনি শিকড় গেড়ে বসেছে বরুড়ার মাটিতে, বছরের পর বছর মানুষের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি নিয়ে।
উদ্বোধনী বক্তব্যে মন্ত্রী আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন,
“আমার বাবা সারাজীবন এই মাটির মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। তাঁর নামে গড়া এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে আজ আমরা সেই মানুষগুলোর কাছে পৌঁছাতে চাইছি, যারা টাকার অভাবে ডাক্তার দেখাতে পারেন না। গরিব মানুষ যেন চিকিৎসার অভাবে মারা না যান এটাই ছিল আমার বাবার জীবনের স্বপ্ন। আজকের এই আয়োজন সেই স্বপ্নেরই অংশ।”
একটি মাঠ, দশটি বিভাগ, বরুড়ায় যেন মিনি হাসপাতাল,
সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত টানা আট ঘণ্টার এই চিকিৎসা শিবিরে যে সেবার পসরা সাজানো হয়েছিল, তা দেখে বরুড়ার মানুষ রীতিমতো অবাক হয়ে যান। একটি বিদ্যালয়ের মাঠে একসঙ্গে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা সেবা দিলেন।
মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি ও প্রসূতি সেবা, শিশু স্বাস্থ্যসেবা, নাক-কান-গলা, অর্থোপেডিক্স, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি এবং ডেন্টাল সার্জারি এই আট বিভাগের পাশাপাশি ব্লাড সুগার পরীক্ষা, ব্লাড গ্রুপিং, বিটি-সিটি পরীক্ষা, হার্টের ইসিজি এবং নেবুলাইজেশন সেবাও দেওয়া হয় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। এমনকি বিনা ব্যথায় আধুনিক ও নিরাপদ পদ্ধতিতে সুন্নতে খৎনার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল।
দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে আসা বরেণ্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা সারাদিন অক্লান্তভাবে রোগী দেখেন। ক্যাম্পের আহ্বায়ক হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের কার্ডিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. সোলাইমান মিয়া এবং সদস্যসচিব কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. শাহজাহান -এর নেতৃত্বে পুরো আয়োজন পরিচালিত হয় অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে।
সার্জারি লাগলেও ভয় নেই, কুমিল্লায় বিনামূল্যে অপারেশন,
ক্যাম্পের সবচেয়ে আলোচিত ও মানবিক সিদ্ধান্তটি ছিল, কোনো রোগীর যদি সার্জারির প্রয়োজন হয়, তাহলে ক্যাম্প থেকে তাঁকে বাছাই করে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সেই সার্জারি করানো হবে। এই ঘোষণা শুনে অনেক রোগীর চোখ ভিজে ওঠে। যাঁরা অপারেশনের প্রয়োজন জেনেও শুধু অর্থের অভাবে পিছিয়ে ছিলেন, তাঁদের জন্য এ যেন এক নতুন জীবনের দরজা খুলে যাওয়া।
মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের বলেন,
“চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার। এই অধিকার থেকে কেউ যেন বঞ্চিত না হন, সেটি নিশ্চিত করতেই আমাদের এই প্রচেষ্টা। একটি ক্যাম্পে যদি একজন মানুষও সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরতে পারেন, তাহলেই আমাদের এই পরিশ্রম সার্থক।”
মাঠ ভরা মানুষ, চোখ ভরা জল,
দিনভর ঝলম কলেজ মাঠে ছিল মানুষের ঢল। বরুড়ার আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে শত শত রোগী ভিড় করেন। লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন বৃদ্ধ, নারী, শিশু সকলেই। অনেকের বছরের পর বছরের পুরনো রোগ, কিন্তু সুযোগ ছিল না। আজ সেই সুযোগ এল।
একজন বয়োজ্যেষ্ঠ রোগী অশ্রুসজল চোখে বলেন, “এত বড় বড় ডাক্তার আইছেন, একটা পয়সাও লাগতেছে না। এইটা স্বপ্নেও ভাবি নাই। আল্লাহ মন্ত্রী সাহেবের ভালো করুক।”
স্মরণে জিয়া, অনুপ্রেরণায় আবু তাহের,
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাৎ বার্ষিকীতে এই মানবিক আয়োজন ছিল গভীর তাৎপর্যবাহী। যে নেতা সারাজীবন দেশের প্রান্তিক মানুষের কথা ভেবেছেন, তাঁর স্মৃতিতে সেই মানুষদের জন্যই বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, এর চেয়ে মহৎ শ্রদ্ধাঞ্জলি আর কী হতে পারে।
মন্ত্রী বলেন, “শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির আসল শক্তি লুকিয়ে থাকে তার সাধারণ মানুষের মধ্যে। তাঁর সেই বিশ্বাস ও আদর্শকে সম্মান জানাতেই আজকের এই আয়োজন। আর আমার বাবা মরহুম এ কে এম আবু তাহেরও এই মাটির মানুষের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে গেছেন। আজ তাঁদের দুজনকেই আমরা স্মরণ করছি কৃতজ্ঞচিত্তে।”
একটি গাছ থেকে একটি বন,দিনশেষে মাঠে রোপণ করা সেই কাঁঠালগাছের চারাটি মাটিতে ধীরে ধীরে শিকড় ছড়াচ্ছিল। একদিন এই গাছ বড় হবে, ডালপালা মেলবে, বরুড়ার মাটিতে ছায়া দেবে। আর এ কে এম আবু তাহের ফাউন্ডেশনের এই উদ্যোগও ঠিক তেমনি ধীরে ধীরে শিকড় গেড়ে একদিন বরুড়ার প্রতিটি অসহায় পরিবারের দুঃখের ছায়া হয়ে উঠবে।
ঝলম কলেজ মাঠে যা হয়েছিল, তা কেবল একটি চিকিৎসা ক্যাম্প ছিল না। ছিল একটি প্রতিশ্রুতির জন্ম, একটি মানবিক রাজনীতির পথচলার সূচনা, ছিল বরুড়ার ইতিহাসের এক স্মরণীয় পৃষ্ঠা।
ঝলম কলেজ মাঠে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প চলাকালীন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহেরের সহধর্মিণী নাজনীন আহমেদের সঙ্গে প্রতিবেদক আনজার শাহের সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়। কথা প্রসঙ্গে তিনি সাংবাদিকতা পেশা নিয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কিছু কথা বলেন।
নাজনীন আহমেদ বলেন, “সাংবাদিকতা একটি মহৎ ও দায়িত্বশীল পেশা। এই পেশার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সত্য। সাদাকে সাদা বলতে হবে, কালোকে কালো বলতে হবে এটাই প্রকৃত সাংবাদিকতা। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করলে সমাজ উপকৃত হয়, মানুষ সঠিক পথ খুঁজে পায়। একজন সৎ সাংবাদিক সমাজের দর্পণ তাঁর কলমই পারে অন্ধকার দূর করে আলো জ্বালাতে।”
তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকরা যদি নিরপেক্ষভাবে সত্য তুলে ধরেন তাহলে দুর্নীতি কমবে, সুশাসন প্রতিষ্ঠা পাবে এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। তাঁর এই দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রতিবেদক আনজার শাহকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে।