জেলা প্রতিনিধি:
গাইবান্ধায় বেওয়ারিশ কুকুর ও শিয়ালের আক্রমণে জনমনে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন এলাকায় কুকুর ও শিয়ালের কামড়ে নারী ও শিশুসহ বহু মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে এক শিশুসহ অন্তত ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরগঞ্জ ও সাদুল্লাপুরে একাধিকবার কুকুর ও শিয়ালের হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত ২০ সেপ্টেম্বর সুন্দরগঞ্জের বেলকা ইউনিয়নের জিগাবাড়ী ও তালুক বেলকা এলাকায় একটি শিয়ালের কামড়ে নারী ও শিশুসহ নয়জন আহত হন। এর পরদিন সাদুল্লাপুরের কামারপাড়া ইউনিয়নের হাটবামুনী গ্রামে কুকুরের কামড়ে সাত বছরের শিশু সিনথিয়ার মৃত্যু হয়।
এর চার দিন পর ২৬ সেপ্টেম্বর সুন্দরগঞ্জের বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের তিনটি গ্রামে একটি কুকুর নারী ও শিশুসহ আটজনকে কামড় দেয়। একই কুকুরের কামড়ে দুটি গরু ও দুটি ছাগলও আক্রান্ত হয়। পরে স্থানীয়রা কুকুরটিকে পিটিয়ে মেরে ফেলেন।
এর আগে ২২ এপ্রিল সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে একটি পাগলা কুকুরের হামলায় ২৬ জন আহত হন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তাদের মধ্যে পাঁচজন পরবর্তী সময়ে মারা যান। মে মাসে ওই পাঁচজনের মৃত্যুর ঘটনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা তদন্তও শুরু করেন।
বাড়ছে উদ্বেগ
গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের ভ্যাকসিন কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত কুকুরসহ বিভিন্ন প্রাণীর আক্রমণের শিকার হয়ে প্রায় সাত হাজার মানুষ ভ্যাকসিন নিয়েছেন। এর মধ্যে শুধু কুকুরের আক্রমণের শিকার হয়েছেন দুই হাজারের বেশি মানুষ। তবে জেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসা নেওয়া ব্যক্তিদের এই হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
গাইবান্ধা শহরের বিভিন্ন এলাকা ও গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা, ময়লার ভাগাড় ও খাবারের দোকানের আশপাশে দলবেঁধে ঘুরছে বেওয়ারিশ কুকুর। কোথাও কোথাও একসঙ্গে ১০ থেকে ১২টি পর্যন্ত কুকুর দেখা যাচ্ছে। এতে স্কুলশিক্ষার্থী, শিশু ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবিদ জানায়, দলবেঁধে কুকুর দেখলে সে ভয় পায়। কুকুরগুলো একসঙ্গে আক্রমণ করতে পারে—এমন আশঙ্কা থাকে তার।
এক নারী অভিভাবক বলেন, শহরে কুকুরের সংখ্যা বেড়েছে। দলবেঁধে চলাফেরা করায় পথচারীদের সব সময় আতঙ্কে থাকতে হয়। কুকুর নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
গাইবান্ধার ভিএইচ রোডের বাসিন্দা আশরাফুল আলম বলেন, রাতে এবং ভোরে চলাচলের সময় কুকুরের আক্রমণের ভয় থাকে। বিশেষ করে দলবদ্ধ কুকুর দেখলে আতঙ্ক তৈরি হয়।
কুকুর-শিয়ালের নমুনায় র্যাবিস
প্রাণিসম্পদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সুন্দরগঞ্জ ও সাদুল্লাপুরে মানুষ ও প্রাণীকে আক্রান্তকারী কুকুর ও শিয়ালের নমুনা পরীক্ষায় র্যাবিস ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সেন্ট্রাল ডিজিজ ইনভেস্টিগেশন ল্যাবরেটরিতে (সিডিআইএল) নমুনাগুলো পরীক্ষা করা হয়।
ঘটনাগুলোর উৎস ও কারণ অনুসন্ধানে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব বিভাগের একটি পর্যবেক্ষক দল মাঠে কাজ করেছে। পাশাপাশি শিয়ালের কামড়ে নয়জন আহত হওয়ার ঘটনায় স্বাস্থ্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের সমন্বয়ে আইইডিসিআরের একটি আউটব্রেক ইনভেস্টিগেশন টিমও অনুসন্ধান চালায়।
দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন
সুন্দরগঞ্জে কুকুরের হামলায় পাঁচজনের মৃত্যুর পর সেখানে কুকুরকে ভ্যাকসিন দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে গাইবান্ধা সদর পৌরসভা ও সাদুল্লাপুরেও কুকুরকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে নিয়মিত ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি না থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
গাইবান্ধা পৌর প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবু হানিফ বলেন, পৌরসভার নিজস্ব বিশেষজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত জনবল নেই। বিপজ্জনক প্রাণী নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পৌরসভার আইনে থাকলেও কুকুর নিধন নিয়ে আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আগে কুকুর বন্ধ্যাকরণের একটি কার্যক্রম থাকলেও সেটিও বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
সাদুল্লাপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. তানভীক জাহান বলেন, কুকুরের আক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে। মানুষের সুরক্ষায় গণহারে ভ্যাকসিন দেওয়াকে বর্তমানে সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. জোবাইদুল কবীর বলেন, পর্যবেক্ষক দলের পরামর্শ অনুযায়ী কার্যক্রম নেওয়া হচ্ছে। তিনি শিশুদের একা না ছাড়ার এবং কুকুরের খুব কাছে না যাওয়ার পরামর্শ দেন।
গাইবান্ধার সিভিল সার্জন ডা. মো. রফিকুজ্জামান বলেন, জলাতঙ্ক প্রতিরোধের ভ্যাকসিনের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। কুকুরের জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে কুকুরকে গণহারে টিকা দেওয়ার পাশাপাশি মানুষকেও প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত চিকিৎসা ও ভ্যাকসিন দেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
চিকিৎসকদের মতে, র্যাবিস বা জলাতঙ্ক প্রাণঘাতী ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত প্রাণীর কামড়, আঁচড় বা লালার মাধ্যমে এটি মানুষের শরীরে ছড়াতে পারে। তবে আক্রান্ত হওয়ার পর দ্রুত ক্ষতস্থান পরিষ্কার করা এবং নির্ধারিত সময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ভ্যাকসিন গ্রহণ করলে রোগটি প্রতিরোধ করা সম্ভব।