চট্টগ্রাম নির্বাচনী মাঠে বিএনপি—জামায়াত সমীকরণ, মাঠ জরিপে চট্টগ্রাম–১৫ আসনে এগিয়ে বিএনপি

কামরুল ইসলাম:

নির্বাচন কমিশনের কঠোর আচরণবিধির কারণে নির্বাচনী মাঠে এখনো পুরোপুরি ভোটের আমেজ না এলেও চট্টগ্রামের প্রতিটি সংসদীয় আসনেই প্রার্থী ও ভোটারদের মধ্যে ভোটের হিসাব—নিকাশ শুরু হয়ে গেছে। দোয়া মাহফিল, কর্মীসভা, উঠান বৈঠক, গণসংযোগসহ নানা কর্মসূচির আড়ালে চলছে নীরব কিন্তু ব্যাপক নির্বাচনী প্রচারণা। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, এলডিপি, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, সুন্নি জোটসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা সক্রিয়ভাবে মাঠে রয়েছেন।

মাঠ পর্যায়ের তথ্য ও স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনের প্রায় প্রতিটিতেই বিএনপি শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। এর মধ্যে কয়েকটি আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরাও প্রভাবশালী অবস্থানে থাকলেও এবারের নির্বাচনে চট্টগ্রাম–১৫ (সাতকানিয়া–লোহাগাড়া) আসনে জামায়াত প্রার্থীর তুলনায় বিএনপি এগিয়ে রয়েছে বলে ধারণা করছেন সচেতন ভোটাররা।

গত ১৫ জানুয়ারি জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটের আসন সমঝোতার পর চট্টগ্রামের নির্বাচনী সমীকরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। সমঝোতা অনুযায়ী, ১৬টি আসনের মধ্যে ৯টি আসন নিজেদের জন্য রেখে বাকি ৬টি আসন জোটের অন্যান্য শরিক দলকে ছেড়ে দেয় জামায়াতে ইসলামী। অপরদিকে চট্টগ্রাম–১১ (বন্দর–পতেঙ্গা) আসনটি উন্মুক্ত রাখা হয়।

১১ দলীয় জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জামায়াতে ইসলামী যে ৯টি আসন নিজেদের জন্য রেখেছে সেগুলো হলো— চট্টগ্রাম–১ (মীরসরাই), চট্টগ্রাম–২ (ফটিকছড়ি), চট্টগ্রাম–৩ (সন্দ্বীপ), চট্টগ্রাম–৪ (সীতাকুণ্ড ও আকবরশাহ), চট্টগ্রাম–৬ (রাউজান), চট্টগ্রাম–৭ (রাঙ্গুনিয়া), চট্টগ্রাম–১০ (ডবলমুরিং, পাহাড়তলী ও হালিশহর), চট্টগ্রাম–১৫ (সাতকানিয়া) এবং চট্টগ্রাম–১৬ (বাঁশখালী)।

এই ৯টি আসনের মধ্যে ৮টিতেই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মী ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অধিকাংশ আসনেই লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি।

চট্টগ্রাম–১১ (বন্দর–পতেঙ্গা) আসনে জামায়াত জোটগতভাবে প্রার্থী না দিলেও এখানে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তার বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ শফিউল আলম শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

চট্টগ্রাম–১ (মীরসরাই) আসনে বিএনপির প্রার্থী নুরুল আমিনের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ ছাইফুর রহমানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একইভাবে চট্টগ্রাম–২ (ফটিকছড়ি) আসনে বিএনপির সরোয়ার আলমগীর ও জামায়াতের মোহাম্মদ নুরুল আমিনের মধ্যে লড়াই জমবে বলে ভোটারদের অভিমত।

চট্টগ্রাম–৩ (সন্দ্বীপ) আসনে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মোস্তফা কামাল পাশার সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুহাম্মদ আলা উদ্দীনের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে। চট্টগ্রাম–৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে বিএনপির মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী এবং জামায়াতের মো. আনোয়ার ছিদ্দিক মুখোমুখি লড়াইয়ে নামছেন।

চট্টগ্রাম–৬ (রাউজান) আসনে বিএনপির গোলাম আকবর খোন্দকার অথবা গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর মধ্যে যিনি চূড়ান্ত মনোনয়ন পাবেন, তার সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. শাহজাহান মঞ্জুরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। চট্টগ্রাম–৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে বিএনপির হুমাম কাদের চৌধুরী এবং জামায়াতের এটিএম রেজাউল করিমের মধ্যে শক্ত লড়াইয়ের আভাস মিলেছে।

চট্টগ্রাম–১০ (ডবলমুরিং–হালিশহর–পাহাড়তলী) আসনে বিএনপির সাঈদ আল নোমান ও জামায়াতে ইসলামীর অধ্যক্ষ মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

সবচেয়ে আলোচিত আসনগুলোর একটি চট্টগ্রাম–১৫ (সাতকানিয়া–লোহাগাড়া)। এখানে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক বিরোধী দলীয় হুইপ শাহজাহান চৌধুরীর বিপরীতে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমীন এগিয়ে রয়েছেন বলে মাঠ জরিপে উঠে এসেছে। স্থানীয় ভোটারদের মতে, সংগঠন ও জনসমর্থনের দিক থেকে বিএনপি এখানে তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে।

চট্টগ্রাম–১৬ (বাঁশখালী) আসনে বিএনপি, জামায়াত ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। বিএনপির প্রার্থী মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী, স্বতন্ত্র প্রার্থী (বিএনপির বিদ্রোহী) মোহাম্মদ লেয়াকত আলী এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুহাম্মদ জহিরুল ইসলামের মধ্যে প্রতিযোগিতা হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ভোটাররা।

১১ দলীয় জোটের অন্য শরিক দলগুলোর মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে চট্টগ্রাম–৮ (বোয়ালখালী ও চান্দগাঁও) আসনে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে চট্টগ্রাম–৫ (হাটহাজারী) আসনে। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) প্রার্থী দেবে চট্টগ্রাম–১২ (পটিয়া) ও চট্টগ্রাম–১৪ (চন্দনাইশ) আসনে। চট্টগ্রাম–৯ আসনে জামায়াতের প্রার্থিতা বাতিল হওয়ায় সেখানে নেজামে ইসলাম পার্টিকে প্রার্থী দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম–৮ আসনে বিএনপির প্রার্থী ও নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ এবং এনসিপির প্রার্থী মো. জোবাইরুল হাসান আরিফের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে বলে জানিয়েছেন ভোটাররা। চট্টগ্রাম–৯ (কোতোয়ালী) আসনে নেজামে ইসলাম পার্টির প্রার্থী মো. নেজাম উদ্দীন ও বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আবু সুফিয়ানের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।

চট্টগ্রাম–১২ (পটিয়া) আসনে এলডিপির প্রার্থী এম. এয়াকুব আলীর মনোনয়ন ঋণ খেলাপির কারণে বাতিল হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। এখানে বিএনপির মোহাম্মদ এনামুল হক ও জামায়াতের ডা. মোহাম্মদ ফরিদুল আলম মাঠে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের চট্টগ্রাম–১৪ (চন্দনাইশ) আসনে বিএনপি, এলডিপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এলডিপির ওমর ফারুক, বিএনপির জসীম উদ্দিন আহমেদ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মিজানুল হক চৌধুরী—তিনজনই মাঠে সক্রিয়।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ২০ জানুয়ারি। প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে ২১ জানুয়ারি এবং প্রচারণা শুরু হবে ২২ জানুয়ারি থেকে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৬৬ লাখ ৮২ হাজার ৫১৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৩৪ লাখ ৮৩ হাজার ৮৭৭ জন, নারী ভোটার ৩১ লাখ ৯৮ হাজার ৫৭০ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৭০ জন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *