ঝটিকা মিছিল ও অনলাইন তৎপরতায় নজরদারি, পুলিশের ভূমিকা খতিয়ে দেখছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক:

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল, গোপন বৈঠক এবং অনলাইন তৎপরতা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর গুলশানে ঝটিকা মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনার পর এ ধরনের কর্মকাণ্ড ঠেকাতে মাঠপর্যায়ে আরও সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে।

গত ১১ সেপ্টেম্বর গুলশান-১ এলাকায় আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের একটি ঝটিকা মিছিল হয়। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে গেলে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পুলিশ রাবার বুলেট ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে পুলিশ। পরে এ ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করা হয়। ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ ঘটনায় গ্রেপ্তারের সংখ্যা ৭৪-এ পৌঁছেছিল বলে পুলিশ জানিয়েছিল।

ঘটনার পর গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ দাউদ হোসেন এবং গুলশান বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) এম তানভীর আহমেদকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে ডিএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। সংশ্লিষ্ট আদেশে উভয় ক্ষেত্রেই প্রশাসনিক কারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

গুলশানের ঘটনার পর প্রশ্ন ওঠে, ওই কর্মসূচি সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে আগাম কোনো তথ্য ছিল কি না এবং থাকলে তা মোকাবিলায় কী ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ পরে জানান, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য ছিল। তবে জুমার নামাজের পর ওই এলাকায় জড়ো হওয়া ব্যক্তিরা এমন কর্মসূচিতে যাবে—পুলিশ তা হয়তো আগে অনুমান করতে পারেনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, গুলশানের ঘটনার মতো দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এসব মিছিলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে রয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের মিছিল কিংবা মিছিলের প্রস্তুতির খবর পাওয়া গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো এলাকায় নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠনের এমন কর্মসূচি হলে স্থানীয় পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে পুলিশের ভেতরে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিষিদ্ধ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করছে কি না, সে বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তবে কোনো নির্দিষ্ট পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য প্রকাশ্যে নিশ্চিত করা হয়নি।

অনলাইন তৎপরতার বিষয়েও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে রাজনৈতিক বক্তব্য, অডিও-ভিডিও এবং বিভিন্ন ধরনের প্রচারসামগ্রী ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে সংগঠনের নেতাকর্মীরা যোগাযোগ বজায় রাখছেন কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

পুলিশের সাবেক কর্মকর্তাদের কেউ কেউ সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ায় বিষয়টি নিয়েও আলোচনা রয়েছে। এসব বক্তব্যের প্রভাব এবং তা পুলিশ সদস্যদের ওপর কোনো ধরনের প্রভাব ফেলছে কি না, সেটিও সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে সূত্রের দাবি।

সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম বলেছেন, পুলিশ একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী এবং পেশাগত দায়িত্ব পালন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করাই পুলিশের মূল কাজ। রাজনৈতিক পক্ষপাত এড়িয়ে পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি আরও বলেন, অতীতে পুলিশে দলীয়করণের অভিযোগ ছিল। তবে বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়ানো উচিত নয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাৎ হোসাইন জানিয়েছেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল বা সংগঠনের অপতৎপরতা রুখে দিতে পুলিশ প্রস্তুত রয়েছে। এ বিষয়ে মাঠপর্যায়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

গুলশানের ঘটনার পর ডিএমপির পক্ষ থেকেও ঝটিকা মিছিল ও আকস্মিক জমায়েত ঠেকাতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সতর্ক করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং কোনো ধরনের সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে গোয়েন্দা নজরদারি ও আইনগত ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *