টাঙ্গাইলে থাকাকালীন জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক তানভীর হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ

খুলনা বুরো প্রধান:

টাঙ্গাইল জেলার খাদ্য বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোঃ তানভীর হোসেনের বিরুদ্ধে নানা মহল থেকে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় ডিলার, খাদ্য গুদামের কর্মকর্তা-কর্মচারী, সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া এসব অভিযোগে বলা হচ্ছে যে, তিনি ডিলারশিপ বাণিজ্য, সরকারি খাদ্যশস্যের অনিয়মিত বিতরণ, ঘুষ গ্রহণ, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত।

সূত্রগুলো জানিয়েছে, এসব অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে চলছে, যা জেলার খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও সরকারি সহায়তা কর্মসূচিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে মোঃ তানভীর হোসেন টাঙ্গাইলের বিভিন্ন উপজেলার খাদ্য গুদাম, ওএমএস (ওপেন মার্কেট সেল), খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান এবং ভিজিএফ-ভিজিডি ও টিসিবি পণ্য বিতরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু অভিযোগকারীদের মতে, তিনি এসব কর্মসূচিকে নিজের স্বার্থ হাসিলের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

বিশেষ করে ডিলারশিপ বিতরণ ও নবায়নে ঘুষের বিনিময়ে পছন্দের ব্যক্তিদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। স্থানীয় ডিলাররা দাবি করেন, নতুন ডিলারশিপ পেতে বা পুরনো লাইসেন্স নবায়ন করতে হলে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিতে হয়, যা সরাসরি জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দপ্তর থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়।

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, টাঙ্গাইলের বিশ্বাস বেতকা এলএসডি গুদামসহ অন্যান্য গুদামে খাদ্যশস্য সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিতরণে অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। উদাহরণস্বরূপ, গুদামের সংরক্ষণ ও চলাচল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অগ্রিম ইনভয়েস স্বাক্ষর, চাল-গমের অবৈধ বিক্রি এবং মজুদের হেরফেরের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, এসব অনিয়মে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নিজে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। এমনকি গুদাম কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শোকজ নোটিশ জারি করা হলেও মূল অভিযোগের তদন্তে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, ভিজিএফ/ভিজিডি কার্ড ইস্যু এবং ওএমএস পয়েন্টে পণ্য বিতরণেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, যোগ্য ব্যক্তিরা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, আর প্রভাবশালী ও অযোগ্যদের কাছে অতিরিক্ত বরাদ্দ যাচ্ছে। অভিযোগ আছে, এসব ক্ষেত্রে ডিলারদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ নেওয়া হয়, যা উপরের স্তরে পৌঁছায় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সরকারি অর্থ আত্মসাতের ঘটনাও উল্লেখযোগ্য। ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানে কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে ধান ক্রয় বা মিল মালিকদের সঙ্গে সমন্বয় করে অতিরিক্ত লাভ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। খাদ্য পরিবহনের নামে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে অর্থ উত্তোলনের ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে। টাঙ্গাইলের খাদ্য গুদামগুলোতে দুদকের অভিযানেও পরিবহন সংক্রান্ত দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে।

অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও কম নয়। স্থানীয় মহলে প্রচার আছে যে, দায়িত্ব পালনকালে মোঃ তানভীর হোসেনের সম্পদের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। জমি-জায়গা, বাড়ি-গাড়ি এবং অন্যান্য সম্পত্তি অর্জন বেতনের তুলনায় অসম্ভব হওয়ায় এই সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহে বাধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। জেলা খাদ্য অধিদপ্তর থেকে লিখিত আদেশ দিয়ে সরাসরি সম্প্রচার ও তথ্য সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, যা অনেকে স্বচ্ছতা এড়ানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) টাঙ্গাইলে একাধিক গণশুনানি করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে, তবে এখনও কোনো চূড়ান্ত ব্যবস্থা দেখা যায়নি। স্থানীয় ডিলার সমিতি ও সচেতন নাগরিকরা দাবি করছেন, উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা না হলে খাদ্য বিভাগের দুর্নীতি চলতেই থাকবে।

খাদ্য বিভাগের মতো স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে অনিয়ম সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলে। টাঙ্গাইলের মতো জেলায় যেখানে দরিদ্র জনগোষ্ঠী অনেক, সেখানে এ ধরনের অনিয়ম সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত তদন্ত করে সত্য উদঘাটন করলে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

টাঙ্গাইলে উঠে আসা এ অভিযোগগুলি খুলনা জেলার মতো অন্যান্য জেলাতেও অনিয়মের ধারা অব্যাহত থাকার প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোঃ তানভীর হোসেন অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন দাবি করেছেন, তবে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য দেননি। স্থানীয়রা আশা করছেন, সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *