ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে ডিএমপির প্রশিক্ষণ কর্মশালা

ফাতেমা খুরশিদ সোমায়া:

সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়াতে দুই দিনব্যাপী ‘রোড ক্র্যাশ ইনভেস্টিগেশন’ শীর্ষক প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ কর্মশালায় দুর্ঘটনাস্থল থেকে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, ঘটনাস্থলের নকশা তৈরি, ছবি ধারণের মাধ্যমে আলামত সংরক্ষণ এবং দুর্ঘটনার পেছনে থাকা বিভিন্ন ঝুঁকি বিশ্লেষণের বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ও আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল রোড সেফটি পার্টনারশিপের (জিআরএসপি) যৌথ উদ্যোগে এবং ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিস ইনিশিয়েটিভ ফর গ্লোবাল রোড সেফটির (বিআইজিআরএস) আওতায় এ কর্মশালার আয়োজন করা হয়। এতে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের ৬০ জন কর্মকর্তা অংশগ্রহণ করেন।

কর্মশালার উদ্বোধন করেন ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিসুর রহমান। উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি ট্রাফিক বিভাগের ১০ জন কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি দক্ষ সড়ক দুর্ঘটনা তদন্তকারী দল গঠনের প্রস্তাব দেন। তাঁর মতে, এ ধরনের বিশেষায়িত দল গঠন করা হলে দুর্ঘটনার তদন্ত কার্যক্রম আরও দক্ষ ও গতিশীল করার পাশাপাশি অন্য পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা এবং প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়নে পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্ভাবনী উদ্যোগ নিতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনার যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ ও সংশ্লিষ্ট ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব। এর ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া গেলে ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখা যাবে।

দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব

কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী খন্দকার মাহবুব আলম। তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনাকে অনিবার্য ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দুর্ঘটনার পেছনে থাকা বিভিন্ন ঝুঁকি ও ত্রুটি চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে অনেক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, সড়কের নকশা ও নির্মাণে ত্রুটি, চালকের ভুল এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের ট্রাফিক আইন ও সড়কব্যবস্থা সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, প্রকৌশলী এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

তাঁর বক্তব্যে দুর্ঘটনার পর শুধু দায়ী ব্যক্তি শনাক্ত করার পাশাপাশি দুর্ঘটনার পেছনে থাকা অবকাঠামোগত সমস্যা, সড়কের নকশাগত ত্রুটি এবং অন্যান্য ঝুঁকির বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে।

দুর্ঘটনাস্থল থেকে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের প্রশিক্ষণ

প্রশিক্ষণ সেশন পরিচালনা করেন জিআরএসপির এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের সিনিয়র রোড পুলিশিং অ্যাডভাইজার পিটার জোন্স। প্রশিক্ষণে সড়ক দুর্ঘটনার যথাযথ তদন্তের গুরুত্ব তুলে ধরার পাশাপাশি তদন্তের বিভিন্ন ধাপ সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দেওয়া হয়।

এ সময় দুর্ঘটনাস্থল থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও আলামত সংগ্রহ, ঘটনাস্থলের স্কেচ বা নকশা তৈরি, ছবি তুলে প্রমাণ সংরক্ষণ এবং সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণের বিভিন্ন কৌশল হাতে-কলমে শেখানো হয়। এসব পদ্ধতি অনুসরণ করে দুর্ঘটনার পরিস্থিতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া এবং তদন্তের তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন করা সহজ হবে বলে কর্মশালায় গুরুত্বারোপ করা হয়।

সড়ক দুর্ঘটনার তদন্তে ঘটনাস্থলের তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলের অবস্থা, যানবাহনের অবস্থান, সড়কের পরিস্থিতি এবং দৃশ্যমান আলামত বিশ্লেষণ করে দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। প্রশিক্ষণে এসব তথ্য সঠিকভাবে সংগ্রহ ও নথিবদ্ধ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

প্রশিক্ষণের জ্ঞান মাঠপর্যায়ে প্রয়োগের আহ্বান

কর্মশালার সমাপনী দিনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডিএনসিসির প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ রাকিবুল হাসান, পিএসসি। তিনি বলেন, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা মাঠপর্যায়ে কাজে লাগানো হলে তবেই সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রকৃত সুফল পাওয়া যাবে।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তারা সড়ক দুর্ঘটনার যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ ও সংশ্লিষ্ট ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করতে পারবেন। এসব তদন্তের ফলাফল কাজে লাগিয়ে নীতিনির্ধারক ও প্রকৌশলীরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন, যা সড়ককে আরও নিরাপদ করার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।

তিনি আরও গুরুত্বারোপ করেন, প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞানকে নিয়মিত দায়িত্ব পালনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান, অবকাঠামোগত সমস্যা এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক পদক্ষেপ চিহ্নিত করা সহজ হবে।

উপস্থিত ছিলেন ডিএমপি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মকর্তারা

কর্মশালায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক-ঢাকা উত্তর) এ এস এম শামসুর রহমান ভূঁঞা, উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক-অ্যাডমিন, প্ল্যানিং অ্যান্ড রিসার্চ) মিনা মাহমুদা, উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক-গুলশান বিভাগ) মো. তারেক জুবায়ের, ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিসের টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার আমিনুল ইসলাম সুজন, বিআইজিআরএসের এনফোর্সমেন্ট কো-অর্ডিনেটর মো. গোলাম হোসেন, ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেটর রেজাউর রহমান, সার্ভেইল্যান্স কো-অর্ডিনেটর ড. তানভীর ইবনে আলী এবং কমিউনিকেশন অফিসার মো. মাহামুদুল হাসানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

কর্মশালায় সড়ক দুর্ঘটনার তদন্তে পুলিশ কর্মকর্তাদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, তথ্য-প্রমাণভিত্তিক তদন্ত কার্যক্রম জোরদার এবং দুর্ঘটনার কারণ চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণের অর্জিত জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগের মাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে আয়োজকেরা আশা প্রকাশ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *