স্টাফ রিপোর্টার:
চট্টগ্রামের সাবেক জেলা প্রশাসক (ডিসি) ফরিদা খানমের দায়িত্ব পালনকাল ঘিরে সরকারি খাসজমি বন্দোবস্ত, পরীর পাহাড়ের জমি, বালুমহাল ইজারা, ইটভাটা, ভূমির রেকর্ড, প্রশাসনিক ক্ষমতার ব্যবহার এবং চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার তহবিল ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে একের পর এক অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রামের প্রথম নারী জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় এক বছরের মধ্যে এসব অভিযোগ নিয়ে একাধিক গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তাকে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে অভিযোগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও ফরিদা খানমের বক্তব্যও এসেছে।
ফরিদা খানমকে চট্টগ্রাম থেকে সরিয়ে নেওয়ার প্রজ্ঞাপন জারির সময় প্রকাশিত প্রতিবেদনে সরকারি জমি লিজ, বালুমহাল ইজারা, ইটভাটা এবং অন্যান্য খাত ঘিরে অনিয়মের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়। ২০২৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর তাকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে বদলি করা হয় এবং একই সময়ে নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আউয়ালকে চট্টগ্রামের নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
তবে ফরিদা খানমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর সবগুলো একই পর্যায়ের নয়। কিছু বিষয়ে গণমাধ্যমে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, কিছু অভিযোগ নিয়ে প্রশাসনিক তদন্তের তথ্য পাওয়া গেছে এবং চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার তহবিল ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নথিপত্র তলব করে অনুসন্ধান শুরু করেছে। আবার কিছু গুরুতর অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা এখনো আদালত বা সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
পাঁচ বছরের জন্য সরকারি খাসজমি বন্দোবস্তের অভিযোগ
ফরিদা খানমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি ছিল সরকারি খাসজমি দীর্ঘমেয়াদে বন্দোবস্ত দেওয়া। ২০২৫ সালের ১৪ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, চট্টগ্রাম নগরের পরীর পাহাড় এলাকায় জেলা প্রশাসনের উচ্ছেদ করা ২৩ শতকের বেশি সরকারি জমি দুটি পক্ষের কাছে পাঁচ বছরের জন্য ভাড়ায় দেওয়া হয়েছে। ১০০ টাকার স্ট্যাম্পে করা একটি অস্থায়ী ভাড়ানামা চুক্তিতে জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে চুক্তি সম্পাদনের বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়াল ও খাসজমি বন্দোবস্ত নীতিমালার উল্লেখ করে বলা হয়, জেলা প্রশাসক নির্দিষ্ট শর্তে সরকারি খাসজমি অস্থায়ীভাবে এক বছরের জন্য বন্দোবস্ত দিতে পারেন; কিন্তু পাঁচ বছর বা তার বেশি সময়ের জন্য ভাড়া বা ইজারার ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। এ কারণেই পরীর পাহাড়ের জমি পাঁচ বছরের জন্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
পরীর পাহাড়ের জমি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক
পরীর পাহাড়ের জমির বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে কারণ ওই এলাকায় আগে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছিল। প্রকাশিত তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ১১ জানুয়ারি তৎকালীন জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামানের সময় পরীর পাহাড়ের সড়কের পাশে গড়ে ওঠা স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। উচ্ছেদের পর ওই জায়গায় জনস্বার্থে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ফরিদা খানম জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ওই জমির একটি অংশ পাঁচ বছরের জন্য লিজ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়, দুটি পৃথক চুক্তির মাধ্যমে প্রায় ২১ শতক জায়গা পাঁচ বছরের জন্য লিজ দেওয়া হয়েছে এবং সেখানে স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছিল। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও অনুমোদন ছাড়া নির্মাণকাজ না করার বিষয়ে জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে চিঠি দিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জায়গাটি একসনা বা এক বছরের জন্য ভাড়ায় দেওয়ার দাবি করা হয়েছিল। ফলে জমিটির প্রকৃত মেয়াদ, চুক্তির আইনগত ভিত্তি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছিল কি না—এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
বালুমহাল ইজারা নিয়েও অভিযোগ
ফরিদা খানমের চট্টগ্রাম কর্মকাল নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বালুমহাল ইজারার বিষয়টিও উঠে এসেছে। পরবর্তী সময়ে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সারসংক্ষেপ প্রকাশ করতে গিয়ে একাধিক সংবাদমাধ্যম বালুমহাল ইজারায় অনিয়মের অভিযোগের কথা উল্লেখ করেছে।
অভিযোগের ধরন ছিল—সরকারি রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, ইজারা প্রক্রিয়া এবং প্রভাবশালী পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন। তবে এ অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রকাশ্য সূত্রে এমন কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি, যাতে ফরিদা খানম ব্যক্তিগতভাবে অনিয়ম করেছেন বলে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
ইটভাটা নিয়েও নানা প্রশ্ন
চট্টগ্রামে বিপুলসংখ্যক ইটভাটা রয়েছে। জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন সভার তথ্য নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, জেলার কয়েকশ ইটভাটার ভূমি উন্নয়ন কর বকেয়া ছিল এবং অবৈধ ইটভাটা বন্ধে প্রশাসনিক নির্দেশনার কথাও উঠে এসেছে। একটি প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম জেলায় ৩৭৩টি ইটভাটার তথ্য উল্লেখ করা হয় এবং বকেয়া ভূমি উন্নয়ন কর আদায় ও অবৈধ ইটভাটা বন্ধে জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের নির্দেশনার কথা বলা হয়।
তবে ফরিদা খানমের বিরুদ্ধে ইটভাটা-সংক্রান্ত ব্যক্তিগত আর্থিক অনিয়মের যে অভিযোগ বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়েছে, তার সবকিছুর স্বাধীন ও চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে এ ধরনের অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।
খাসজমির রেকর্ড ও নামজারি নিয়ে তদন্ত
ফরিদা খানমের কর্মকাল ঘিরে ভূমি ব্যবস্থাপনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ ছিল সরকারি খাসজমি ব্যক্তিমালিকানায় নামজারি করে দেওয়ার বিষয়টি। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ ও বায়েজিদ থানার হিলভিউ আবাসিক এলাকার খাসজমি ব্যক্তিমালিকানায় নামজারির বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। কমিটি ভূমির রেকর্ড, রেজিস্টার, আদালতের আদেশ ও নামজারি-সংক্রান্ত কাগজপত্র পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের পরিচালক মোমিনুর রশীদের বক্তব্যও প্রকাশিত হয় যে তদন্ত প্রতিবেদন ভূমি মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে এবং পরবর্তী ব্যবস্থা মন্ত্রণালয় নেবে।
ফরিদা খানম তখন অভিযোগ প্রসঙ্গে বলেন, ভূমি মন্ত্রণালয় তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে; তবে বিষয়টি শুধু তার একার বিরুদ্ধে নয়, সার্বিকভাবে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।
চিড়িয়াখানার তহবিল ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন
ফরিদা খানমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নথি ও গণমাধ্যম প্রতিবেদন সামনে আসে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার তহবিল ব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্র করে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রশাসন ক্যাডারের পিকনিক ও পুনর্মিলনী, বিজ্ঞাপন এবং অন্যান্য খাতে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার তহবিল থেকে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।
ঢাকা পোস্টের এক প্রতিবেদনে চিড়িয়াখানার প্রাণীদের খাবারের অর্থ থেকে পিকনিক ও বিজ্ঞাপনে টাকা ব্যয়ের অভিযোগ তুলে ধরা হয়। একই প্রতিবেদনে জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের বক্তব্যও প্রকাশ করা হয়। তিনি দাবি করেছিলেন, চিড়িয়াখানা জেলা প্রশাসনেরই প্রতিষ্ঠান এবং তহবিল কীভাবে ব্যয় করা হবে সে বিষয়ে তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে; তার ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হয়নি।
প্রায় ১৬ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ব্যয়ের অভিযোগ
চিড়িয়াখানার তহবিল ব্যবহারের নথি ঘিরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রায় ১৬ লাখ ৭৫ হাজার টাকা বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের কথা উঠে আসে। এর মধ্যে প্রশাসন ক্যাডারের পুনর্মিলনী ও পিকনিক উপলক্ষে বিজ্ঞাপন, জাতীয় দিবস উদযাপন, ব্যক্তিগত অনুদান, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে বিজ্ঞাপন এবং ডিসি পার্কের রং করার মতো খাতের উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রশাসন ক্যাডারের ২৪তম বিসিএস অ্যাসোসিয়েশনের গ্র্যান্ড পুনর্মিলনী ও পিকনিক উপলক্ষে দুই দফায় বিজ্ঞাপন বাবদ ২ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়। রংপুরে কর্মরত একজন শিক্ষানবিশ সহকারী কমিশনারকে ব্যক্তিগত অনুদান হিসেবে ১ লাখ টাকা দেওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বিজয় দিবস, গণহত্যা দিবস ও স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আরও অর্থ ব্যয়ের কথা উঠে আসে।
এ ছাড়া ঢাকা বিয়াম ফাউন্ডেশনে এসি বিস্ফোরণে হতাহতদের সহায়তা, বিভাগীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতার বিজ্ঞাপন, একটি সামাজিক সংগঠনকে বিজ্ঞাপন এবং ডিসি পার্কে রং করার খরচও চিড়িয়াখানার তহবিল থেকে হয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
‘এক খাতের টাকা অন্য খাতে’ ব্যয়ের প্রশ্ন
চিড়িয়াখানার তহবিল মূলত প্রাণী সংগ্রহ, প্রাণীর আবাসন উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের কাজে ব্যবহারের কথা। কিন্তু ওই তহবিল থেকে প্রশাসনিক বা সামাজিক বিভিন্ন কাজে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে—এমন অভিযোগ প্রকাশিত হওয়ার পর প্রশ্ন ওঠে, নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে সংগৃহীত অর্থ অন্য খাতে ব্যয়ের ক্ষেত্রে কী ধরনের অনুমোদন প্রয়োজন এবং সেই অনুমোদন যথাযথভাবে নেওয়া হয়েছিল কি না।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনে ফরিদা খানমের বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়, তহবিলের অর্থ কোথায় ব্যয় করা হবে সেটি তার এখতিয়ার এবং অর্থ আত্মসাৎ না হলে বিষয়টি নিয়ে সমস্যা নেই—এমন অবস্থান তিনি জানিয়েছিলেন।
দুদকের অনুসন্ধানে চিড়িয়াখানার নথি তলব
চিড়িয়াখানার তহবিল ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগটি পরবর্তীতে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানের পর্যায়ে যায়। দুদক চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার ডেপুটি কিউরেটর ডা. মো. শাহাদাত হোসেন শুভর কাছে বিভিন্ন নথি, ব্যাংক হিসাব, চেক এবং ব্যয়ের অনুমোদনসংক্রান্ত কাগজপত্র চেয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে চিড়িয়াখানার গঠনতন্ত্র, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত ব্যয়ের অনুমোদনসংক্রান্ত নথি, নির্বাহী কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের তথ্য, চেকের স্বাক্ষরকারীদের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবের নথি চাওয়া হয়। কয়েকটি নির্দিষ্ট চেকের সত্যায়িত অনুলিপি এবং সেগুলোর অর্থ কোন হিসাবে জমা হয়েছে—সেই তথ্যও চাওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া ডেপুটি কিউরেটর ডা. শাহাদাত হোসেন শুভকে দুদকের কার্যালয়ে হাজির হয়ে বক্তব্য দেওয়ার জন্য নোটিশ দেওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ চিড়িয়াখানার তহবিল নিয়ে বিষয়টি কেবল গণমাধ্যমের অভিযোগের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানের পর্যায়েও গিয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে এফডিআর নিয়েও প্রশ্ন
চিড়িয়াখানার তহবিল ব্যবস্থাপনার আরেকটি আলোচিত বিষয় ছিল ব্যাংকে রাখা মেয়াদি আমানত। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, চিড়িয়াখানার তহবিল থেকে দুটি ব্যাংকে মোট ২ কোটি টাকার এফডিআর করা হয়েছিল। এর মধ্যে একটি ব্যাংকে ১ কোটি টাকা রাখা হয় এবং পরবর্তীতে ওই ব্যাংকের আর্থিক সংকটের কারণে অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে জটিলতার কথা প্রকাশ্যে আসে।
এ নিয়ে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রতিকার চেয়ে চিঠি দিয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে এই অর্থ বিনিয়োগের সিদ্ধান্তের সঙ্গে ফরিদা খানমের ব্যক্তিগতভাবে কোনো আর্থিক সুবিধা নেওয়ার প্রমাণ প্রকাশ্য নথিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ
ফরিদা খানমের বিরুদ্ধে প্রকাশিত অভিযোগগুলোর একটি বড় অংশই ছিল প্রশাসনিক ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে। এর মধ্যে সরকারি খাসজমি বন্দোবস্ত, ভূমির নামজারি, বালুমহাল ইজারা, বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং তহবিল ব্যয়ের বিষয় রয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তার বদলির সময়ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসব অভিযোগের সমন্বিত উল্লেখ করা হয়।
তবে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কোনো সিদ্ধান্ত ক্ষমতার অপব্যবহার ছিল কি না, তা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট আইন, অনুমোদন, নথি ও তদন্তের ফলাফল বিবেচনা করা প্রয়োজন। কেবল অভিযোগ বা গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায় না।
এক বছরের মাথায় চট্টগ্রাম থেকে প্রত্যাহার
ফরিদা খানম ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেন। এরপর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তাকে চট্টগ্রাম থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। পরে তাকে একাধিক মন্ত্রণালয়ে বদলির তথ্যও গণমাধ্যমে আসে।
চট্টগ্রাম থেকে সরিয়ে নেওয়ার পর তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কিছু বিষয়ে তদন্ত চলমান ছিল বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য প্রকাশিত হয়। বিশেষ করে ভূমি-সংক্রান্ত অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
পরবর্তী সময়ে ঢাকার ডিসি নিয়োগ ঘিরেও পুরোনো অভিযোগ সামনে আসে
২০২৬ সালের এপ্রিলে ফরিদা খানমকে ঢাকা জেলার জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলে চট্টগ্রামের কর্মকাল নিয়ে পুরোনো অভিযোগগুলো আবারও আলোচনায় আসে। ঢাকাটাইমসের প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে বালুমহাল ইজারা, সরকারি জমি নিয়মবহির্ভূতভাবে বন্দোবস্ত, রেকর্ড জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং এক খাতের তহবিল অন্য খাতে ব্যয়ের অভিযোগের কথা পুনরায় উল্লেখ করা হয়।
অন্য একটি প্রতিবেদনে একই ধরনের অভিযোগের তালিকা তুলে ধরে বলা হয়, চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে এসব অভিযোগের কারণে তাকে এক বছরের মাথায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
তবে এসব প্রতিবেদনের মধ্যে কিছু অভিযোগ পুরোনো সূত্রের পুনরুল্লেখ এবং কিছু অভিযোগের তদন্তের ফল এখনো প্রকাশ্য নয়। ফলে প্রতিটি অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্তের বর্তমান অবস্থা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগের বিপরীতে ফরিদা খানমের অবস্থান
ফরিদা খানম বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার বা ব্যাখ্যা করেছেন। চিড়িয়াখানার তহবিলের বিষয়ে তিনি বলেছেন, তহবিলের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে তার এখতিয়ার রয়েছে এবং তিনি কোনো অনৈতিক কাজ করেননি। একইভাবে ভূমি-সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে তিনি তদন্তের কথা স্বীকার করলেও বিষয়টি শুধু তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় বলে দাবি করেছেন।
অর্থাৎ, ফরিদা খানমের বিরুদ্ধে প্রকাশিত অভিযোগের পাশাপাশি তার নিজের বক্তব্যও রয়েছে। এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে দুদক, ভূমি মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সামনে মূল প্রশ্ন তদন্তের ফল
ফরিদা খানমের চট্টগ্রাম কর্মকাল ঘিরে প্রকাশিত অভিযোগগুলোকে মোটামুটি কয়েকটি বড় ভাগে ভাগ করা যায়—সরকারি খাসজমি বন্দোবস্ত, পরীর পাহাড়ের জমি, বালুমহাল ইজারা, ইটভাটা ও ভূমি রেকর্ড, প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রয়োগ এবং চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার তহবিল ব্যবস্থাপনা।
এর মধ্যে পরীর পাহাড়ের জমি পাঁচ বছরের জন্য দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে গণমাধ্যমে নথিভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। চিড়িয়াখানার তহবিল নিয়ে নথি ও ব্যাংক হিসাব তলব করে দুদকের অনুসন্ধানের তথ্যও প্রকাশ্যে এসেছে। অন্যদিকে বালুমহাল, ইটভাটা ও রেকর্ড-সংক্রান্ত অভিযোগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিবেদন ও তদন্তের কথা থাকলেও সব অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি বা অপরাধ প্রমাণের তথ্য প্রকাশ্যে নেই।
ফলে ফরিদা খানমের চট্টগ্রাম অধ্যায় নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখন অভিযোগের সংখ্যা নয়, বরং কোন অভিযোগের ক্ষেত্রে কী নথি পাওয়া গেছে, কোন তদন্ত কোথায় দাঁড়িয়ে আছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেয়—সেটি। সরকারি জমি, জনসাধারণের অর্থ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের তহবিল ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়ে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ রয়েছে।