পড়াশোনা শেষ করে চাকরির পেছনে না ছুটে মাঠে নেমেছেন শাহিনুর, স্বপ্ন এখন বৃহৎ মৎস্য সাম্রাজ্য গড়ার!

 

শেরপুরের শ্রীবরদীর এই তরুণ উদ্যোক্তার পাশে দাঁড়ানোর আকুল আবেদন সরকারের কাছে

শেরপুর প্রতিনিধি :

কামিল (মাস্টার্স) পাস করার পর অনেকেই সরকারি চাকরির জন্য দ্বারে দ্বারে ঘোরেন। কিন্তু শেরপুর জেলার শ্রীবরদী উপজেলার গড়জরিপা গ্রামের তরুণ মো. শাহিনুর আকন্দ সেই পথে হাঁটেননি। ইসলামিক স্টাডিজে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করার পরও তিনি বেছে নিয়েছেন উদ্যোক্তার কণ্টকাকীর্ণ কিন্তু গৌরবময় পথ। নিজের গ্রামের মাটিকে ভালোবেসে, নিজস্ব অর্থায়নে গড়ে তুলেছেন মৎস্য খামার, সবজি বাগান ও বৃক্ষরোপণ প্রকল্প। প্রতি বছর আড়াই থেকে তিন লক্ষ টাকা আয় করছেন এই উদ্যমী তরুণ। এখন তাঁর স্বপ্ন আরও বড় বৃহৎ পরিসরে মৎস্য প্রকল্প গড়ে হাজারো বেকার যুবকের কর্মসংস্থান তৈরি করা। তবে সেই স্বপ্ন পূরণে তাঁর একটাই বাধা পর্যাপ্ত পুঁজির অভাব। তাই সরকারি সহায়তার জন্য তিনি আকুল আবেদন জানিয়েছেন উপজেলা মৎস্য ও কৃষি কর্মকর্তার কাছে।

যেভাবে শুরু এই তরুণের উদ্যোক্তা জীবন,১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর শেরপুর জেলার শ্রীবরদী উপজেলার গড়জরিপা গ্রামের আকন্দবাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন মো. শাহিনুর আকন্দ। পিতা মো. আ. মমিন এবং মাতা ছামছুন্নাহারের এই সন্তান শিক্ষার সর্বোচ্চ ধাপ কামিল (মাস্টার্স) পর্যন্ত পৌঁছেছেন। ইসলামিক স্টাডিজে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করার পর যখন অনেক সমবয়সী বন্ধু সরকারি চাকরির পরীক্ষার ফর্ম তুলছিলেন, তখন শাহিনুর তাঁর চোখ মেলে তাকালেন নিজের গ্রামের পুকুর আর মাঠের দিকে।

সেই থেকেই শুরু। নিজস্ব অর্থায়নে গ্রামের ছোট-বড় পুকুর ও মাঠের জমিতে শুরু করলেন মৎস্য চাষ। পাশাপাশি সবজি চাষ, কলাগাছ রোপণ ও বৃক্ষরোপণেও হাত দিলেন। নবী মৎস্য হ্যাচারি গড়ে তুললেন নিজের উদ্যোগে। একে একে সাজিয়ে তুললেন একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি ও মৎস্য উদ্যোগ।

বছরে আড়াই থেকে তিন লক্ষ টাকা আয়,শাহিনুর আকন্দের পরিশ্রম আর নিষ্ঠা বৃথা যায়নি। তাঁর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত মৎস্য খামারগুলোতে প্রয়োজনীয় মৎস্য খাবার সরবরাহ করে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার ফলে প্রতি বছর আড়াই থেকে তিন লক্ষ টাকা আয় করছেন তিনি। এলাকার অনেক তরুণের কাছে তিনি এখন অনুপ্রেরণার প্রতীক একটি জীবন্ত উদাহরণ যে, উচ্চশিক্ষিত হয়েও কৃষি ও মৎস্য খাতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব।

স্বপ্ন বড়, বাধা শুধু পুঁজির অভাব,

তবে এখানেই থেমে থাকতে চান না শাহিনুর। তাঁর স্বপ্ন আরও বিশাল। তিনি চান শ্রীবরদী উপজেলায় বৃহৎ পরিসরে একটি আধুনিক মৎস্য প্রকল্প ও কৃষি কমপ্লেক্স গড়ে তুলতে। যেখানে একসঙ্গে চলবে মৎস্য চাষ, সবজি উৎপাদন, ফলের বাগান এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ। এই বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এলাকার অসংখ্য বেকার তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন।

কিন্তু স্বপ্নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পর্যাপ্ত পুঁজির অভাব। নিজের সীমিত সঞ্চয় দিয়ে এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তাই তিনি সরকারের দিকে তাকিয়ে আছেন সহায়তার আশায়।

মৎস্য ও কৃষি কর্মকর্তার কাছে আকুল আবেদন,

মো. শাহিনুর আকন্দ শ্রীবরদী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ও কৃষি কর্মকর্তার কাছে আন্তরিকভাবে আবেদন জানিয়েছেন, তাঁর মৎস্য খামার ও কৃষি উদ্যোগটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে যদি সরকারি প্রণোদনা, কৃষি ঋণ বা অনুদানের আওতায় তাঁকে সহায়তা প্রদান করা হয়, তাহলে তিনি বৃহৎ পরিসরে মৎস্য প্রকল্প ও কৃষি কমপ্লেক্স গড়ে তুলতে সক্ষম হবেন।

তিনি বলেন, “আমি চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেই কর্মসংস্থান তৈরি করতে চেয়েছি। সরকার যদি একটু পাশে দাঁড়ায়, তাহলে আমি শুধু নিজে নয় — এলাকার অনেক বেকার ভাই-বোনের মুখেও হাসি ফোটাতে পারব।”

বিশেষজ্ঞদের মতামত,

কৃষি ও মৎস্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শাহিনুর আকন্দের মতো উচ্চশিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তারাই দেশের কৃষি খাতকে আধুনিক ও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক করে তুলতে পারেন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ শর্তে কৃষিঋণ পেলে এই ধরনের তরুণ উদ্যোক্তারা গ্রামীণ অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম।

 

একটি তরুণের প্রত্যাশা, একটি অঞ্চলের সম্ভাবনা,

শাহিনুর আকন্দের গল্প কেবল একজন তরুণের সংগ্রামের গল্প নয় এটি একটি অঞ্চলের সম্ভাবনার গল্প। শেরপুরের শ্রীবরদীর এই মেধাবী ও পরিশ্রমী তরুণ প্রমাণ করেছেন যে, ইচ্ছাশক্তি ও কঠোর পরিশ্রম থাকলে উচ্চশিক্ষিত হয়েও কৃষিকে পেশা হিসেবে নিয়ে সফল হওয়া সম্ভব।

এখন দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সরকারের কাছে প্রত্যাশা — এই স্বপ্নবান তরুণের পাশে দাঁড়ানো হোক। তাঁর হাতকে শক্তিশালী করা হোক সরকারি সহায়তায়। তাহলে শুধু শাহিনুর নয়, তাঁর হাত ধরে জেগে উঠবে গোটা শ্রীবরদী সৃষ্টি হবে হাজারো বেকার তরুণের কর্মসংস্থান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *