ফেসবুক পোস্টে অনুদান চাওয়ায় সমালোচনা

মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী:

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল আমিন নির্বাচনী খরচ জোগাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে অনুদান চেয়ে পোস্ট দেওয়ায় স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ‘উন্মুক্ত ডোনেশন’-এর আহ্বান জানিয়ে তিনি গত রোববার (৪ জানুয়ারি) দুপুরে নিজের ফেসবুক আইডিতে ওই পোস্ট দেন।

ফেসবুক পোস্টে ব্যাংক হিসাব নম্বর, নগদ ও বিকাশ নম্বর উল্লেখ করে সরাসরি অর্থ সহায়তা চাওয়াকে কেউ কেউ রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের উদ্যোগ হিসেবে দেখলেও অনেকের মতে এটি নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের শামিল। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে ভিন্নমত দেখা গেছে।

আব্দুল্লাহ আল আমিনের ফেসবুক পোস্ট প্রসঙ্গে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ও দলটির কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য মাওলানা মাঈনুদ্দিন বলেন, “মানুষ চাইলে ব্যক্তিগতভাবে কারও কাছে সহযোগিতা চাইতে পারে। কিন্তু এভাবে প্রকাশ্যে বিজ্ঞাপন দিয়ে অর্থ চাওয়াটা না করলেও চলত।”

খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের এক নেতা বলেন, “ফেসবুক পোস্ট দিয়ে অল-ওভার ফান্ডিং বা উন্মুক্ত অনুদান নেওয়া যাবে কি না—এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা জরুরি। না হলে ভবিষ্যতে এটি বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।”

উল্লেখ্য, আব্দুল্লাহ আল আমিন নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) আসনে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সমর্থিত প্রার্থী। তাঁকে সমর্থন জানিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি আবদুল জব্বার।

ফেসবুক পোস্টে আব্দুল্লাহ আল আমিন লেখেন, তিনি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির শাপলা কলি প্রতীকে নির্বাচন করছেন। তিনি দাবি করেন, অতীতে উপজেলা পর্যায়ের একটি নির্বাচন করতেও কোটি কোটি টাকা খরচ হতো। নতুন বাংলাদেশে সেই রাজনীতির সংস্কৃতি বদলাতে চান তিনি। গডফাদার, মাফিয়া ও চাঁদাবাজিনির্ভর রাজনীতির পরিবর্তন করতেই এই লড়াই বলে উল্লেখ করেন তিনি।

পোস্টে তিনি আরও লেখেন, “রাজনীতি হবে জনমানুষের জন্য, গুটিকয়েকের জন্য নয়। রাজনীতিতে নিশ্চিত করতে হবে সাধারণ মানুষের কণ্ঠ ও প্রতিনিধিত্ব।” তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, তাঁর রাজনীতি হবে জনগণের রাজনীতি—চাঁদাবাজি, মাফিয়াগিরি, সিন্ডিকেট ও মাদকের বিরুদ্ধে তিনি প্রকাশ্যে অবস্থান নেবেন। পাশাপাশি ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং আধিপত্যবাদবিরোধী বাংলাদেশপন্থি রাজনীতি গড়ে তোলার কথাও উল্লেখ করেন।

আব্দুল্লাহ আল আমিন জানান, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৪০ হাজার ৮১৩ জন। নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ব্যয় সীমা অনুযায়ী ভোটারপ্রতি ১০ টাকা হিসেবে সর্বোচ্চ ৫৪ লাখ ৮ হাজার ১৩০ টাকা খরচ করতে পারবেন তিনি। এই লক্ষ্য পূরণে নারায়ণগঞ্জবাসীর সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। তরুণ পেশাজীবী হিসেবে এ অর্থের জোগান দেওয়া তাঁর একার পক্ষে কঠিন হলেও সবাই অংশ নিলে এটি সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

এ বিষয়ে এনসিপি প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, “পোস্ট দেওয়ার পর থেকেই অনুদান আসতে শুরু করেছে। এটি পুরোপুরি বৈধ। নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ হলেই উন্মুক্ত ডোনেশন বন্ধ করে দেব।”

তবে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা এস এম ফয়েজ উদ্দিন বলেন, “ফেসবুকে এভাবে অর্থ চাওয়ার বিষয়টি এক ধরনের প্রচারণার মধ্যে পড়ে। প্রতীক বরাদ্দের আগে কোনো প্রার্থী প্রচার চালাতে পারেন না। সে কারণে এটি আচরণবিধি লঙ্ঘনের শামিল। লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির বলেন, “প্রথমে ফেসবুক পোস্টটি পর্যালোচনা করা হবে। কী ধরনের পোস্ট দেওয়া হয়েছে, সেটি নির্বাচনী বিধিমালার লঙ্ঘন কি না—তা যাচাই-বাছাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ফেসবুক পোস্টে প্রকাশ্যে অনুদান আহ্বানের বিষয়টি আগামী দিনে নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *