বরুড়ায় ভাইরাল অভিযোগের আড়ালে মিথ্যার জাল: তদন্তে রহস্য উদ্‌ঘাটন, ইউএনওর  বার্তা

মোঃআনজার শাহ

একটি ভিডিও। কয়েক মিনিটের মধ্যেই লাখো মানুষের মুঠোফোনে। অভিযোগ ছিল ভয়াবহ সরকারি কার্যালয়ে অনিয়ম, ভাতা বন্ধ করে একজন জীবিত মানুষকে “মৃত” দেখিয়ে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি হতে সময় লাগেনি। কিন্তু প্রশাসনের তদন্তে বেরিয়ে এলো সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতা যা প্রশ্ন তুলে দিয়েছে ভাইরাল কনটেন্টের সত্যতা নিয়েই।
কুমিল্লার বরুড়া উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়কে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া এই অভিযোগের তদন্ত শেষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসাদুজ্জামান রনি জানিয়েছেন, ফেসবুকে প্রচারিত তথ্য বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

অভিযোগ যখন নজরে আসে,
বিষয়টি নজরে আসার পরপরই ইউএনও গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন। তিনি ডেকে আনেন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা কামরুল হাসান রনিকে, চান বিস্তারিত ব্যাখ্যা।
ইউএনও আসাদুজ্জামান রনি বলেন, “অভিযোগে যাঁর বাবার ভাতা বন্ধ করে তাঁকে মৃত দেখানোর কথা বলা হয়েছে, সমাজসেবার অনলাইন ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার ও ওয়েবসাইট যাচাই করে দেখা যায়, ওই ব্যক্তির বাবার কোনো আবেদনই অনলাইনে করা হয়নি। খোঁজখবর করে আমি নিশ্চিত হয়েছি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্যটি ভুল ও বিভ্রান্তিকর।”

যা ঘটেছিল বাস্তবে,
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা কামরুল হাসান রনির বর্ণনায় উঠে আসে ঘটনার বিস্তারিত চিত্র। গত ২৪ জুন দুপুরে এক ব্যক্তি কার্যালয়ে এসে অভিযোগ করেন, তাঁর বাবার ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং তাঁকে মৃত দেখানো হয়েছে। অভিযোগ জানানোর পাশাপাশি তিনি অফিসের কার্যক্রমের ভিডিও ধারণ করেন এবং কর্মচারীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন বলে দাবি করা হয়েছে।
সে সময় দাপ্তরিক কাজে কার্যালয়ের বাইরে ছিলেন কামরুল হাসান রনি। পরে ওই ব্যক্তি লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়ার পাশাপাশি ধারণকৃত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন, যা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়।

তিনি বলেন, “বাড়ি ফিরে বিষয়টি যাচাই করি। আমাদের ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যারে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বাবার কোনো তথ্য বা আবেদনের অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। আমরা স্ক্রিন রেকর্ডিংসহ প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংরক্ষণ করেছি। অভিযোগটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন প্রতীয়মান হওয়ায় বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করা হয়েছে।”
থানায় জিডি, আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি
ঘটনার জের ধরে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের ইউনিয়ন সমাজকর্মী মো. কাজী শাহীন বরুড়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দাখিল করেন।

থানার নথি অনুযায়ী, জিডি নম্বর ১২৭৪, তারিখ ২৫ জুন ২০২৬। অভিযোগে বলা হয়েছে, একটি ফেসবুক আইডি থেকে ধারাবাহিকভাবে সমাজসেবা কার্যালয়ের বিরুদ্ধে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর ও মানহানিকর ভিডিও প্রচার করা হয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন করেছে এবং জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে।

জিডিতে আরও উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্ত ব্যক্তি অফিসে এসে ভিডিও ধারণের পর তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন, যা দ্রুত ভাইরাল হয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্ট ভিডিওর লিংক, স্ক্রিনশট ও অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণ থানায় জমা দেওয়া হয়েছে।
জিডির ভিত্তিতে বরুড়া থানা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি রেকর্ডভুক্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছে।
প্রশ্নের মুখে ডিজিটাল দায়িত্বশীলতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য প্রকাশ বা শেয়ার করার আগে তার সত্যতা যাচাই করা এখন সময়ের অন্যতম জরুরি দাবি। কারণ একটি বিভ্রান্তিকর তথ্য মুহূর্তেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়ে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রীয় সেবার ওপর জনআস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

বরুড়ার এই ঘটনা নতুন করে সামনে আনল এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সত্য উদ্‌ঘাটনের আগেই অভিযোগকে সত্য বলে মেনে নেওয়া হলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন নিরপরাধ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। তথ্যের এই যুগে দায়িত্বশীলতা, যাচাই-বাছাই এবং সত্য অনুসন্ধানের কোনো বিকল্প নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *