বাংলাদেশ কোন পথে: অন্তর্বর্তী সরকারের দায় এবং ৭১-এর চেতনার ভবিষ্যৎ

এইচ এম হাকিম:

৫ই আগস্টের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে রাষ্ট্র, রাজনীতি, কূটনীতি এবং আদর্শিক অবস্থান—সবকিছুই নতুনভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, সংঘাত, একদলীয় আধিপত্য এবং জনঅসন্তোষের পটভূমিতে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জনগণের কাছে এক নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছিল। বিশেষ করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে দায়িত্ব গ্রহণের পর অনেকেই ভেবেছিলেন বাংলাদেশ হয়তো একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে এগোবে, যেখানে গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা, মানবাধিকার এবং অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আশার অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনামল শেষ হওয়ার পর দেশের রাজনীতি এখন আরও জটিল, বিভক্ত এবং অনিশ্চিত বাস্তবতার মধ্যে প্রবেশ করেছে।

এই সরকারের সময় আন্তর্জাতিক রাজনীতির মেরুকরণ বাংলাদেশের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে শুরু করে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন কৌশলগত ও অর্থনৈতিক চুক্তি দেশের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতিকে এক নতুন নির্ভরশীলতার দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে সমালোচনা রয়েছে। সরকার এসব চুক্তিকে উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে তুলে ধরলেও অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণে বিদেশি প্রভাব বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বর্তমান নির্বাচিত বিএনপি সরকার এখন সেই চুক্তিগুলোর দায় বহন করছে। একদিকে আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের জনগণের সার্বভৌমত্ববিষয়ক উদ্বেগ সামাল দিতে হচ্ছে। ফলে সরকারকে প্রতিনিয়ত কূটনৈতিক ভারসাম্যের এক কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।

রাজনৈতিক অঙ্গনেও একইসঙ্গে তৈরি হয়েছে এক অস্বাভাবিক শূন্যতা। আওয়ামী লীগকে কার্যত নিষিদ্ধ ও রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার পর দেশের রাজনীতিতে যে বড় পরিসরের ফাঁকা জায়গা সৃষ্টি হয়েছে, তা প্রত্যাশামতো বিএনপি পূরণ করতে পারেনি। বরং সবচেয়ে সংগঠিতভাবে সেই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। দীর্ঘদিন ধরেই দলটি তৃণমূলভিত্তিক সাংগঠনিক শক্তি, ক্যাডারনির্ভর কার্যক্রম এবং আদর্শিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। বর্তমানে বিএনপি যখন প্রশাসনিক চাপ, অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং এবং ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় ব্যস্ত, তখন জামায়াত ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে তরুণদের একটি অংশের মধ্যে তাদের সাংগঠনিক উপস্থিতি দৃশ্যমানভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। যদি বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকে, তবে আগামী এক দশকের মধ্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। কারণ রাজনৈতিক শূন্যতা কখনো দীর্ঘস্থায়ী থাকে না। কোনো না কোনো শক্তি সেটি পূরণ করবেই। বিএনপি যদি নিজেদের সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে না পারে এবং আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ভারসাম্য পুনর্গঠন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে বিকল্প শক্তির উত্থান অনিবার্য হয়ে উঠবে।

আওয়ামী লীগের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী দলকে পুরোপুরি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। একটি বড় রাজনৈতিক শক্তিকে দমন করার মাধ্যমে সাময়িকভাবে প্রতিপক্ষ দুর্বল করা গেলেও এর ফলাফল শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের জন্য শুভ হয় না। কারণ এতে লাখো নেতাকর্মী ও সমর্থকের মধ্যে ক্ষোভ, হতাশা এবং প্রতিশোধস্পৃহা জন্ম নেয়। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে যদি গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখা যায়, তবে তা একসময় উগ্রবাদ, সহিংসতা কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী প্রবণতায় রূপ নিতে পারে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বারবার সেই সতর্কবার্তা দিয়েছে।

অন্যদিকে বিএনপির বর্তমান অবস্থা নিয়েও জনমনে নানা প্রশ্ন রয়েছে। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর ক্ষমতায় এলেও দলটি এখনও একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক দর্শন জনগণের সামনে স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করতে পারেনি। দলীয় অভ্যন্তরে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, প্রভাব বিস্তার এবং পদ-পদবিকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে আদর্শিক রাজনীতির পরিবর্তে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকেন্দ্রিক রাজনীতি প্রভাব বিস্তার করছে। এতে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মূল শক্তিই দুর্বল হয়ে পড়ছে। একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল যখন নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকট সামাল দিতেই ব্যস্ত থাকে, তখন জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শের ভবিষ্যৎ। স্বাধীনতা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এটি ছিল দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ফল। ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মদান এবং অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতার মূল ভিত্তি ছিল বাঙালির আত্মপরিচয়, অসাম্প্রদায়িকতা, গণতন্ত্র এবং শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন। কিন্তু আজ সেই চেতনা রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যে ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়লে স্বাধীনতার মূল দর্শনও সংকটের মুখে পড়ে।

বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের মৌলিক প্রশ্নে সবাইকে একমত হতে হবে। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কোনো রাজনৈতিক দলের একক সম্পত্তি নয়। এটি পুরো জাতির অস্তিত্বের প্রশ্ন। তাই ক্ষমতার রাজনীতিকে কেন্দ্র করে যদি বিভেদ আরও বাড়তে থাকে, তবে বহির্বিশ্বের শক্তিগুলো সেই সুযোগ নেবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, অভ্যন্তরীণ বিভক্তি সবসময় বিদেশি হস্তক্ষেপের পথ সহজ করে দেয়।

বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য হতে পারে ভয়াবহ। অর্থনৈতিক চাপ, বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, সামাজিক অস্থিরতা এবং আদর্শিক বিভক্তি—সবকিছু মিলিয়ে রাষ্ট্রকে এখন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে। শুধুমাত্র ক্ষমতা ধরে রাখা বা প্রতিপক্ষকে দমন করাই কোনো সরকারের একমাত্র দায়িত্ব হতে পারে না। জনগণের আস্থা অর্জন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

তাই বর্তমান সরকারের পাশাপাশি দেশের সকল রাজনৈতিক শক্তির উচিত সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষা করতে হলে কেবল স্লোগান নয়, বাস্তব রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসের সঠিক শিক্ষা দিতে হবে, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী করে তুলতে হবে এবং রাজনৈতিক সহাবস্থানের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর এসেও যদি আমাদের অস্তিত্ব ও আদর্শ রক্ষার লড়াই করতে হয়, তবে সেটি হবে জাতি হিসেবে আমাদের বড় ব্যর্থতা। বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা, স্বাধীনতার চেতনা এবং জাতীয় মর্যাদা রক্ষার জন্য এখনই সময় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। দেশপ্রেম, গণতন্ত্র এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে সমুন্নত রেখেই গড়ে উঠুক আগামী দিনের বাংলাদেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *