বিদেশ সফর ও বিতর্কে পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ডিজি

আলমাস হোসাইন:

ক্ষমতার পালাবদল হলেও বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক (ডিজি) ড. এ এস এম সাইফুল্লাহর প্রভাব এখনো অটুট রয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে তিনি একের পর এক বিদেশ সফর করেছেন, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করেছেন এবং সরকারি অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগেও তার নাম উঠে এসেছে।

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে রদবদল হলেও কীভাবে ড. সাইফুল্লাহ মহাপরিচালকের পদে বহাল রয়েছেন, তা নিয়ে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ও বহির্বিশ্বে প্রশ্ন ও ক্ষোভ বাড়ছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তিনি অন্তত ৩৫ বার বিদেশ সফর করেছেন। সফরের তালিকায় রয়েছে অস্ট্রিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া, নেদারল্যান্ডস, সিঙ্গাপুর ও চীনসহ মোট ১৩টি দেশ।

অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানের মেধাবী ও জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের সুযোগ না দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সেমিনার ও প্রশিক্ষণে তিনি নিজেই অংশ নিয়েছেন। জীববিজ্ঞান শাখার বিজ্ঞানী সত্ত্বেও ক্ষমতার জোরে ভৌতবিজ্ঞান, প্রকৌশল ও পরিকল্পনা শাখার বৈদেশিক প্রশিক্ষণেও অংশ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বিদেশ সফর ব্যক্তিগত সুযোগ নয়; এটি প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু বছরের পর বছর একই ব্যক্তির বিদেশযাত্রার কারণে অন্য কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগটি ২০১৭ সালের একটি বিদেশ সফরকে ঘিরে। মে ২০১৭ সালে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কারিগরি সহযোগিতা কর্মসূচির ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত সম্মেলনে তিনি অংশ নেন। সরকারি আদেশে সব ব্যয় দাতা সংস্থার বহনের কথা স্পষ্ট থাকলেও অভিযোগ অনুযায়ী, ড. সাইফুল্লাহ তৎকালীন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে সফরের কিছু ব্যয় কমিশনের তহবিল থেকে দেখানো হয়। এতে সরকারি অর্থ ব্যবহারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রশাসনে পরিবর্তন এলেও ড. সাইফুল্লাহ আগের মতোই প্রভাব ধরে রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ডিঙিয়ে প্রায় ১০ কোটি টাকার বিনিময়ে তিনি মহাপরিচালকের পদ বাগিয়ে নেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানান, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় তিনি এখনো প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছেন, যা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। প্রতিষ্ঠানের এক জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী বলেন, “বছরের পর বছর একই ব্যক্তি বিদেশ সফরে গেলে অন্যদের দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ নষ্ট হয়। এটি কোনোভাবেই গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জন্য শুভ নয়।”

মহাপরিচালক ড. এ এস এম সাইফুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন, অভিযোগগুলো স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হোক। প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানানো হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *