জেলা প্রতিনিধি:
ইলিশের ভরা মৌসুমেও পদ্মা-যমুনা নদীতে কাঙ্ক্ষিত ইলিশের দেখা মিলছে না। দিন-রাত নদীতে জাল ফেলেও আশানুরূপ মাছ না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরছেন জেলেরা। এতে জ্বালানি ও নৌকার খরচই উঠছে না অনেকের। অন্যদিকে দাদনের ঋণের বোঝা বাড়তে থাকায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন দরিদ্র জেলেরা।
ভাদ্র-আশ্বিন—এই দুই মাসকে ইলিশের ভরা মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। এ সময়ে জেলেদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে রুপালি ইলিশ ধরা পড়ার কথা। মাছের আড়তগুলোও সরগরম থাকার কথা ক্রেতা-বিক্রেতার পদচারণায়। তবে এ বছর আরিচা ঘাটের যমুনা নদীর তীরের আড়তগুলোতে ইলিশের উপস্থিতি খুবই কম।
স্থানীয় বাজারগুলোতেও ইলিশের সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে দাম বেড়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। জেলেরা বলছেন, নদীতে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পাওয়ায় দিন-রাত মাছ ধরেও তাদের খরচ উঠছে না। এতে পরিবার-পরিজন নিয়ে কষ্টে দিন কাটাতে হচ্ছে তাদের।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সকালে আরিচা ঘাটের মাছের আড়ত ঘুরে দেখা যায়, পদ্মা-যমুনা থেকে অল্প পরিমাণ মাছ নিয়ে জেলেদের নৌকা তীরে ভিড়ছে। কোনো কোনো নৌকায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা জাল ফেলার পরও মাত্র এক-দুটি ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। আবার অনেক জেলে ইলিশ ছাড়াই ফিরছেন।
একটি নৌকায় সাধারণত তিন থেকে ছয়জন জেলে থাকেন। দীর্ঘ সময় নদীতে অবস্থান, জ্বালানি ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতিদিন তাদের বড় অঙ্কের ব্যয় হয়। কিন্তু মাছ না পাওয়ায় সেই খরচও উঠছে না। ফলে জেলেদের কাছ থেকে বেশি দামে ইলিশ কিনতে হচ্ছে আড়তদারদের। পরে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে আরও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে সেই মাছ।
আরিচা ঘাটের আড়তদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছর এক কেজি ইলিশের দাম ছিল প্রায় এক হাজার টাকা। বর্তমানে একই আকারের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। কিছুদিন আগে পদ্মা-যমুনার ইলিশের দাম প্রতি কেজি ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছিল।
শিবালয় উপজেলা মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, উপজেলার জাফরগঞ্জ পালপাড়া থেকে বাল্লা মালুচি পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকাকে ইলিশের বিশেষ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ এলাকায় বর্ষা মৌসুমে ইলিশ পাওয়া যায়। উপজেলায় নিবন্ধিত কার্ডধারী জেলের সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার ২০০। এর বাইরেও অনেক জেলে নদীতে মাছ ধরেন।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিবালয় উপজেলায় ৪৯৯ মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদন হয়েছে। ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে বছরে দুইবার জেলেদের খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়। গত অর্থবছরে মা ইলিশ সংরক্ষণকালীন ২ হাজার ১১৪টি জেলে পরিবারকে দুই মাসে মাসিক ২৫ কেজি করে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জাটকা সংরক্ষণকালীন ৬৫০টি জেলে পরিবারকে ৮০ কেজি করে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
আরিচা ঘাটের আড়তদার হাজী মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ইলিশ গভীর পানির মাছ। নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে পদ্মা-যমুনায় ইলিশের বিচরণ কমে যাচ্ছে। ইলিশের পরিমাণ কমে যাওয়ায় অনেক আড়তদারও সমস্যায় পড়েছেন। কারও আড়ত বন্ধ হয়ে গেছে, আবার কেউ বন্ধ হওয়ার পথে।
চৌহালির জেলে ইউসুফ আলী বলেন, ছয়জন জেলে মিলে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা নদীতে মাছ ধরেও ২ থেকে ৩ হাজার টাকার ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। অথচ এর চেয়ে খরচ হচ্ছে বেশি। গত বছর এক খেওতেই ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার ইলিশ পাওয়া গেলেও এবার তিন খেও দিয়েও ১০ হাজার টাকার ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। আড়তদারদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে নদীতে নামায় এখন সেই টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়েই দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা।
আরিচা অঞ্চলের জেলে অজিত হলদার বলেন, পাঁচজন জেলে মিলে ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত নদীতে জাল ফেলে মাত্র দুটি ছোট ইলিশ পেয়েছেন। সেগুলো বিক্রি করে ৪ হাজার টাকা পাওয়া গেছে, যা দিয়ে জ্বালানি খরচও ওঠেনি।
শিবালয়ের ছোটবোয়ালী গ্রামের জেলে প্রেমো হলদার বলেন, গত বছর দুই মাসে একটি নৌকা থেকে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হয়েছিল। এবার দিন-রাত নদীতে থেকেও ৩ থেকে ৪ হাজার টাকার মাছ পাওয়া যাচ্ছে। এতে নৌকা, ইঞ্জিন ও জ্বালানির খরচই উঠছে না। অনেক জেলে মাছ ধরা ছেড়ে অন্য কাজে চলে যাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।
মানিকগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শেখ মনিরুল ইসলাম মনির বলেন, ইলিশ মূলত সমুদ্রের গভীর পানির মাছ। বর্ষা মৌসুমে ডিম ছাড়ার জন্য ইলিশ পদ্মা-যমুনায় আসে। তবে নদীর নাব্যতা সংকট, অপরিকল্পিত ড্রেজিং, নদীতে ডুবোচর, জলবায়ু পরিবর্তন, পানি দূষণ এবং অবৈধ কারেন্ট জাল ব্যবহারসহ বিভিন্ন কারণে ইলিশের বিচরণ ও উৎপাদন কমছে।
তিনি আরও বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময় অসাধু জেলেদের মাছ ধরার বিষয়টিও ইলিশের ওপর প্রভাব ফেলছে। তবে এখনো মৌসুমের সময় বাকি রয়েছে। এ সময়ের মধ্যে নদীতে আরও ইলিশ আসতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।