মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন:
খুলনা জেলার রূপসা উপজেলায় খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আশরাফুজ্জামান এর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য, বদলি-নিয়োগ বাণিজ্য এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নতুন করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর মামলা (নং ০৪/২০২২) দায়েরের পরও তিনি বুক ফুলিয়ে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। স্থানীয় সুশীল সমাজ, কৃষক, ডিলার এবং খাদ্য বিভাগের অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে পাওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
পদ-পদবি ও পটভূমি
মো. আশরাফুজ্জামান বর্তমানে রূপসা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে কর্মরত। তিনি খুলনা বিভাগীয় খাদ্য পরিদর্শক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক। এছাড়া তিনি বি.এল. কলেজ, দৌলতপুর-এর সাবেক যুবলীগ নেতা। সাবেক যুবলীগ নেতা থাকার সময় শিবির নেতা হত্যার আসামি হিসেবে তাঁর নাম জানা যায়। মো. আশরাফুজ্জামান ও তার স্ত্রী রোকেয়া সুলতানাও দুদকের মামলায় আসামি।
দুদক মামলা: জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ ও গোপন
দুদক যশোর সমন্বিত কার্যালয়ে ২০২২ সালের জুলাই মাসে মামলা দায়ের করা হয় (বাদী: সহকারী পরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন)।
অভিযোগের মূল বিষয়:
-
১ কোটি ৯ লাখ টাকা জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন।
-
১ কোটি ১৬ লাখ টাকা মূল্যের সম্পদের বিবরণী গোপন।
-
সম্পদের বড় অংশ স্ত্রী রোকেয়া সুলতানার নামে বা বেনামে কেনা হয়েছে বলে অভিযোগ।
-
যশোর খাদ্য গুদাম (২০১৮–২০২০) ও তেরখাদা থেকে ঘুষ-অনিয়মের অর্থ এখানে রূপান্তরিত।
বদলি ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ
খাদ্য পরিদর্শক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে তার প্রভাবে খুলনা বিভাগে বদলি ও নিয়োগ বাণিজ্য চলছে। গুদাম ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও খাদ্য পরিদর্শকদের পদায়নে লাখ লাখ টাকা ঘুষের মাধ্যমে সুবিধা নেওয়া হয়। অভিযোগকারীরা বলেন, তার ইশারায়ই এসব সংগঠিত হয়। মো. আশরাফুজ্জামানের কথা যে সমস্ত কর্মকর্তা না শুনেছে, তাদের কেটে ফেলা হয়েছে।
পূর্ববর্তী কর্মকর্তাদের হেনস্তা
পূর্ববর্তী সরকারের আমলে (যাকে অভিযোগকারীরা “ফ্যাসিস্ট সরকার” বলে উল্লেখ করেন) একাধিক আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক (আরসি ফুড) ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ডিসি ফুড)-কে হেনস্তা করার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে তৎকালীন আরসি ফুড সেলিমুল আজম (বর্তমানে অতিরিক্ত পরিচালক, খাদ্য অধিদপ্তর, ঢাকা) তিনি খুলনা থাকা কালিন সময় আশরাফুজ্জামানের অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় লাঞ্ছিত ও বেয়াদবি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসবের মাধ্যমে খুলনা বিভাগে তার প্রভাব বিস্তার করে কোটি কোটি টাকা হাতানো হয়েছে।
চলমান অনিয়ম ও বিলাসী জীবনযাপন
রূপসায় কর্মরত অবস্থায়ও অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে:
-
ধান-চাল সংগ্রহে কেজিপ্রতি ১০ পয়সা থেকে ১ টাকা ঘুষ।
-
ভুয়া কৃষকের নামে বিল উত্তোলন।
-
পচা-পুরনো চাল বিতরণ (ওএমএস, ভিজিএফে)।
-
নতুন বস্তা কেনার নামে পুরানো বস্তা কিনে কোটি টাকা আত্মসাৎ।
-
অবৈধ অর্থ দিয়ে গাড়ি, বাড়ি, বিলাসী জীবনযাপন।
দুদক মামলা সত্ত্বেও তিনি খুলনা মহানগরীতে বহাল তবিয়তে চাকরি করছেন।
খুলনা বিভাগের খাদ্য বিভাগে দুর্নীতি ও অনিয়ম
খুলনা আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক (আরসি ফুড) মো. মামুনুর রশীদকে জিম্মি করে রাখার অভিযোগ রয়েছে। মো. আশরাফুজ্জামান সোহাগ দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ড হিসেবে কাজ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সূত্রমতে তিনি:
-
গুদামে অনিয়ম চালাচ্ছেন।
-
ডিলার পয়েন্ট থেকে চাঁদা আদায় করছেন।
-
স্থানীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করে খাদ্য বিভাগকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
-
খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের চাপ দিয়ে দুর্নীতি এগিয়ে নিচ্ছেন।
২৮ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে খুলনা বিভাগের খাদ্য বিভাগ, খুলনা সিএসডি গোডাউনে খাদ্য কর্তৃপক্ষের সকল জেলার কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি গোপন নৈশভোজ ও বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই বৈঠকে গুদাম অনিয়ম, ডিলারদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়, স্থানীয় প্রভাব খাটানো এবং খাদ্য বিভাগকে হাতের কাছে সাজানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
অভিযোগের প্রভাব ও প্রেক্ষাপট
মো. আশরাফুজ্জামান সোহাগকে খুলনা বিভাগের খাদ্য পরিদর্শক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে খলনায়ক হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে রূপসা উপজেলায় দুদকের মামলা রয়েছে, যেখানে তার স্ত্রীও জড়িত। শেখ মনিরুল হাসানের বিরুদ্ধেও বাগেরহাটে দুদকের মামলা রয়েছে।
খুলনা বিভাগের খাদ্য গুদামগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে চলমান দুর্নীতির চিত্র:
-
ধান-চাল সংগ্রহে কেজিপ্রতি ১ টাকা পর্যন্ত ঘুষ।
-
নতুন বস্তার বদলে পুরানো বস্তা ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ।
-
বদলি বাণিজ্য ও ভুয়া বিল উত্তোলন।
-
ওএমএস ডিলারদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়।
এসব অনিয়মে আরসি ফুড ও ডিসি ফুড জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। মামুনুর রশীদের বিরুদ্ধে বদলি বাণিজ্য, ঘুষ এবং হাইকোর্টের আদেশ অমান্যের অভিযোগ রয়েছে।
খাদ্য বিভাগের দুর্নীতির প্রেক্ষাপট
খুলনা বিভাগে খাদ্য গুদামগুলোতে (যেমন: খুলনা সদর, বটিয়াঘাটা, দাকোপ, রূপসা, ডুমুরিয়া, তেরখাদা) বছরের পর বছর অনিয়ম চলছে। আমন-বোরো মৌসুমে ধান-চাল সংগ্রহে নিম্নমানের পণ্য গ্রহণ, অতিরিক্ত সংগ্রহ দেখিয়ে আত্মসাৎ, পচা চাল বিতরণ ইত্যাদি অভিযোগ নিয়মিত। দরিদ্র জনগোষ্ঠী খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে নিম্নমানের খাদ্য পাচ্ছে, যা সরকারি কোষাগারের ব্যাপক ক্ষতি করছে।
আশরাফুজ্জামানের মতো ব্যক্তিরা স্থানীয় প্রভাব, সংগঠনিক পদ এবং কিছু কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঁতাত করে এসব নিয়ন্ত্রণ করছেন। তারা খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের চাপ দিয়ে বা ভয় দেখিয়ে দুর্নীতির পথ প্রশস্ত করছেন।
দাবি ও প্রতিক্রিয়া
এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন স্থানীয় ডিলার, খাদ্য পরিদর্শক এবং সচেতন মহল। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে খাদ্য বিভাগের স্বচ্ছতা ও জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।
দৈনিক স্বাধীন সংবাদ এই বিষয়ে আরও অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির দাবি জানানো হচ্ছে।