স্টাফ রিপোর্টার:
বান্দরবানের লামা উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ মাতামুহুরি নদী তীর সংরক্ষণ ও শহর রক্ষা প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, নিম্নমানের নির্মাণকাজ এবং তদারকির ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্প নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ ও অসন্তোষ। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য নদীভাঙন প্রতিরোধ ও শহর রক্ষা হলেও কাজের মান নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দেওয়ায় ভবিষ্যতে প্রকল্পটির স্থায়িত্ব নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মাতামুহুরি নদীর ভাঙন থেকে লামা পৌর এলাকা ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পটি দুইটি পৃথক প্যাকেজে বিভক্ত করে দুইটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে শুরু থেকেই প্রকল্পের কাজে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, সিমেন্টের পরিমাণ কম দেওয়া, দেশীয় পাথর ও অপরিশোধিত নদীর বালু ব্যবহার করে ব্লক তৈরি এবং ব্লকের মান ঠিক না রাখার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রকল্প এলাকায় যেসব কংক্রিট ব্লক তৈরি করা হচ্ছে, তার অনেকগুলোতেই নির্ধারিত অনুপাতে সিমেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে না। ফলে ব্লকগুলো সহজেই ভেঙে যাচ্ছে। তারা আশঙ্কা করছেন, বর্ষা মৌসুমে নদীর তীব্র স্রোতের মুখে এসব ব্লক টিকবে না এবং কয়েক বছরের মধ্যেই পুরো প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নদীর তীর ঘেঁষে বিভিন্ন স্থানে ব্লক ডাম্পিংয়ের কাজ চললেও সেখানে প্রকৌশলী বা দায়িত্বপ্রাপ্ত তদারকি কর্মকর্তাদের উপস্থিতি খুব কম। অধিকাংশ সময় শ্রমিকরাই নিজেদের মতো করে কাজ পরিচালনা করছেন। এতে ব্লক বসানোর গভীরতা, সারিবদ্ধতা ও প্লেসিংয়ের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে স্থানীয়দের মধ্যে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পে ব্যবহৃত জিও-টেক্সটাইলের ওপর নির্ধারিত পুরুত্বে কংক্রিট ঢালাই দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা অনুসরণ করা হচ্ছে না। কোথাও কোথাও কংক্রিটের পুরুত্ব এক ইঞ্চিরও কম পাওয়া গেছে বলে দাবি স্থানীয়দের। একইসঙ্গে গাইড ওয়াল নির্মাণ এবং ঝিরির মুখে ব্লক বসানোর কাজেও পরিকল্পনা অনুযায়ী মান রক্ষা করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, প্রায় এক হাজার মিটার এলাকাজুড়ে নদীতে দেড় লাখের বেশি ব্লক ডাম্পিং করার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এখন পর্যন্ত কতসংখ্যক ব্লক ডাম্পিং করা হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব সাইটে থাকা কর্মীরা দিতে পারেননি। এতে প্রকল্পের অগ্রগতি এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু কর্মকর্তা নিয়মিত তদারকি করছেন না। বরং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণে অনিয়মের বিষয়গুলো উপেক্ষা করা হচ্ছে। ফলে প্রকল্পে দায়সারা কাজ হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শ্রমিক জানান, দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য অনেক সময় নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ না করেই ব্লক ফেলা হচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও পর্যাপ্ত শুকানোর আগেই ব্লক নদীতে ডাম্পিং করা হচ্ছে। এতে ব্লকের স্থায়িত্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা এক ম্যানেজারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রকল্পের কারিগরি বিষয় এবং ব্লকের মান নিয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি। অন্যদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এক প্রতিনিধি দাবি করেন, স্থানীয় বাজারে বালুর মূল্য বেশি হওয়ায় অতিরিক্ত খরচে নির্মাণসামগ্রী সংগ্রহ করতে হচ্ছে। তারপরও প্রকল্পের গুণগত মান বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সূত্রে আরও জানা গেছে, আগামী জুন ২০২৬ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ের আগেই কাজ শেষ করার জন্য দ্রুতগতিতে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
এদিকে প্রকল্পের অনিয়ম ও নিম্নমানের কাজের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কাউকে পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, মাতামুহুরি নদীর ভয়াবহ ভাঙনের কারণে অতীতে বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাই কোটি কোটি টাকার এই প্রকল্পে অনিয়ম হলে তা শুধু সরকারি অর্থের অপচয়ই নয়, বরং ভবিষ্যতে লামা শহর ও আশপাশের জনপদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে।
স্থানীয় সচেতন মহল প্রকল্পটির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, নির্মাণকাজের গুণগত মান যাচাই এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।