কামরুল ইসলাম:
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় দিন দিন বেড়েই চলেছে চুরি ও ডাকাতির ঘটনা। একের পর এক চুরি-ডাকাতির ঘটনায় নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার, মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ মূল্যবান মালামাল নিয়ে যাচ্ছে দুর্বৃত্তরা। কোথাও কোথাও অস্ত্রের মুখে পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করে ডাকাতির অভিযোগও উঠেছে। এসব ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে রাত নামলেই চুরি-ডাকাতির আতঙ্কে অনেক পরিবার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চুরি-ডাকাতির ঘটনায় থানায় অভিযোগ করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে পুলিশের তৎপরতা দৃশ্যমান নয়। ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে বিষয়টি থানায় অবহিত করা এবং তদন্তের কথা বলা হলেও কার্যকর অগ্রগতি না থাকায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী জানিয়েছেন, চুরি-ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ নিয়মিত কাজ করছে এবং অপরাধপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, লোহাগাড়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে সাম্প্রতিক সময়ে চুরি-ডাকাতির ঘটনা বেড়েছে। সংঘবদ্ধ চোর ও ডাকাত চক্র গভীর রাতে অথবা পরিবারের সদস্যরা বাড়ির বাইরে থাকার সুযোগ নিয়ে ঘরের তালা, সিটকানি, জানালার গ্রিল কিংবা দরজা ভেঙে প্রবেশ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর আলমারি ও ড্রয়ার ভেঙে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান মালামাল লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাড়ির বাইরে রাখা যানবাহনও চুরি হয়ে যাচ্ছে।
গত দেড় মাসের বিভিন্ন ঘটনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, উপজেলার একাধিক ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় চুরি ও ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। কোথাও একই রাতে একাধিক বাড়িতে চুরির ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। বিশেষ করে ফাঁকা বাড়িগুলো চোর-ডাকাতদের প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সর্বশেষ শুক্রবার রাতে কলাউজান ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আদারচর এলাকায় শিক্ষক আলিম সামাদের বসতঘরে চুরির ঘটনা ঘটে। তার দাবি, চোরেরা ঘরে প্রবেশ করে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকারসহ প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকার মালামাল নিয়ে যায়। একই রাতে সদর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের তালুকদার পাড়ায় প্রবাসী জসিম উদ্দিনের বাড়িতেও চুরির ঘটনা ঘটে। একই রাতে বড়হাতিয়া ইউনিয়নের আমতলী বেপারী পাড়া থেকে মুজিবুর রহমানের একটি সিএনজিচালিত গাড়িও দুর্বৃত্তরা চুরি করে নিয়ে যায় বলে জানা গেছে।
এর মাত্র কয়েকদিন আগে গত ২৩ আগস্ট রাতে আমিরাবাদ ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের আমির খান চৌধুরী পাড়ায় কফিল উদ্দিনের বসতঘরে ঢুকে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে যায় চোরেরা। একই এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকা আনোয়ার হোসেনের একটি মোটরসাইকেলও চুরি হয়। ওই রাতেই আরও দুটি বাড়িতে চুরির চেষ্টা চালানো হয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তবে বাড়ির লোকজন সজাগ হয়ে উঠলে চোরেরা পালিয়ে যায়।
অস্ত্রের মুখে ডাকাতি, লুট প্রায় ১৮ লাখ টাকার মালামাল
চুরির পাশাপাশি ভয়াবহ ডাকাতির ঘটনাও স্থানীয়দের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গত ১৭ আগস্ট ভোরে উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মল্লিক ছোবহান তজু মুন্সির গ্যারেজ এলাকায় অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে বসতঘরে ডাকাতির অভিযোগ ওঠে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসী জমির উদ্দিন ও হেলাল উদ্দিনের পরিবারের দাবি, ডাকাতরা নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার, মোবাইল ফোনসহ প্রায় ১৮ লাখ টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। এ ঘটনার পর থেকে ওই এলাকার মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা আরও বেড়েছে।
শুধু বসতবাড়িই নয়, চোরদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও। গত ৩ আগস্ট রাতে সদর ইউনিয়নের দরবেশহাট এলাকার শাহী দরবেশিয়া জামে মসজিদের জানালার গ্রিল কেটে আইপিএসের ব্যাটারি ও দানবাক্স ভেঙে নগদ টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। এর আগে গত ১৯ জুলাই রাতে চুনতি ইউনিয়নের সুফিনগর মসজিদে-আর-রাহমা থেকে প্রায় ৪০০ গজ বৈদ্যুতিক তার কেটে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
গত ২০ আগস্ট কলাউজান ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আদারচর এলাকায় মোহাম্মদ আলী হায়দারের ফাঁকা বসতঘরেও চুরির ঘটনা ঘটে। এছাড়া গত ১৪ জুলাই রাতে আমিরাবাদ ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের আমির খান চৌধুরী পাড়ায় প্রবাসী জুনু মিয়ার ফাঁকা বাড়িতে চুরি হয়। পরিবারের দাবি, সেখান থেকে প্রায় ৬ ভরি স্বর্ণালংকার ও নগদ ২০ হাজার টাকা নিয়ে যায় চোরেরা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পরিবারের সদস্যরা চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গেলে, আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গেলে কিংবা কয়েক দিনের জন্য বাড়ি ফাঁকা রেখে অন্যত্র গেলে সেই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে চোরেরা। দিনের বেলায় পরিবারের লোকজন কর্মস্থল বা প্রয়োজনীয় কাজে বাইরে থাকলেও বাড়ির নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় থাকতে হচ্ছে অনেককে। ফলে অনেক পরিবার এখন বাড়িঘরের নিরাপত্তায় অতিরিক্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিচ্ছেন।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা বলেন, এলাকায় অপরিচিত লোকজনের চলাচল নিয়ে অনেক সময় সন্দেহ তৈরি হলেও যথাযথ নজরদারি না থাকায় তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাদের অভিযোগ, মাদকসেবী, অনলাইন জুয়ায় আসক্ত ব্যক্তি ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের একটি অংশ ছোটখাটো অপরাধ থেকে বড় ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। পাশাপাশি উপজেলার বিভিন্ন নির্জন সড়ক ও এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে সামাজিক মর্যাদা, ভয় কিংবা মামলা-সংক্রান্ত জটিলতার আশঙ্কায় অনেক ভুক্তভোগী সব ঘটনা প্রকাশ্যে আনতে চান না।
চিকিৎসার টাকা হারিয়ে দুশ্চিন্তায় শিক্ষক আলিম সামাদ
সর্বশেষ চুরির ঘটনায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন শিক্ষক আলিম সামাদ। তিনি জানান, চুরির দিন পারিবারিক নানা সমস্যায় তিনি ব্যস্ত ছিলেন। তার স্ত্রী অসুস্থ থাকায় সারাদিন তাকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। সন্ধ্যার দিকে তার মা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়লে পরিবারের সদস্যরা তাকে নিয়ে পাশের এলাকায় বসবাসরত বড় ভাই আবু বক্করের বাড়িতে চলে যান। পরিবারের সদস্যদের অনুপস্থিতির সুযোগেই চোরেরা তার বাড়িতে প্রবেশ করে বলে তিনি জানান।
আলিম সামাদ বলেন, চুরি হওয়া নগদ টাকা তার সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি ও জায়গা থেকে ধার-কর্জ করে সংগ্রহ করেছিলেন। সেই টাকা হারিয়ে এখন স্ত্রীর চিকিৎসা কীভাবে চালাবেন, তা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি। তার মতো আরও অনেক ভুক্তভোগী চুরি-ডাকাতির ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন বলে স্থানীয়রা জানান।
মাদক, জুয়া ও কিশোর গ্যাং নিয়েও উদ্বেগ
সচেতন মহলের মতে, লোহাগাড়ায় চুরি-ডাকাতির বিষয়টি শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখলে সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করা কঠিন হবে। এর পেছনে মাদক, অনলাইন জুয়া, বেকারত্ব, অসৎ সঙ্গ এবং পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়সহ বিভিন্ন কারণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে দ্রুত টাকা পাওয়ার আশায় তরুণদের একটি অংশ সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছে। পরে অর্থের ঘাটতি পূরণ করতে কেউ কেউ চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে মনে করছেন তারা।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু চুরি-ডাকাতির ঘটনার পর মামলা ও গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। অপরাধের কারণগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর বিরুদ্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে নিয়মিত পুলিশি টহল বাড়ানো, গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নজরদারি জোরদার করা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয় বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
তাদের মতে, বিশেষ করে রাতের বেলায় নির্জন সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে পুলিশের টহল বাড়ানো জরুরি। সন্দেহজনক ব্যক্তিদের গতিবিধির ওপর নজরদারি এবং চুরি-ডাকাতির ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা গেলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরতে পারে।
একই সঙ্গে মাদক, অনলাইন জুয়া ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনারও দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধ সংঘটনের আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করতে পারলে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
পুলিশের বক্তব্য
সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, চুরি-ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ নিয়মিত কাজ করছে। অপরাধপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে পুলিশের টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, কোনো অপরাধের ঘটনা ঘটলে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ তৎপর রয়েছে। মাদক, অনলাইন জুয়া ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধেও পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
অপরাধ দমনে পুলিশের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন উল্লেখ করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, সন্দেহজনক কোনো ব্যক্তি বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেলে দ্রুত পুলিশকে জানাতে হবে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, একের পর এক চুরি-ডাকাতির ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে মাঠপর্যায়ে পুলিশের দৃশ্যমান তৎপরতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। দ্রুত চোর ও ডাকাত চক্র শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি নিয়মিত টহল ও নজরদারি জোরদার করা না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, লোহাগাড়ার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকেও নিজেদের বাড়িঘর ও আশপাশের এলাকার নিরাপত্তায় সচেতন থাকতে হবে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে চুরি-ডাকাতির আতঙ্ক কমিয়ে লোহাগাড়ায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।