অনলাইন ডেস্ক:
দেশের সরকারি স্কুল-কলেজগুলোর বিভিন্ন তহবিলে বিপুল পরিমাণ টাকা দীর্ঘদিন ধরে অব্যয়িত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এসব অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা নিতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে সরকারি স্কুল-কলেজগুলোর প্রধানদের কাছে অব্যয়িত অর্থের হিসাব চাওয়া হয়েছে। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানরা এসব অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষার্থীদের ভর্তি ও অন্যান্য কার্যক্রমের সময় বিভিন্ন খাতে অর্থ নেওয়া হলেও সব খাতের টাকা একই সময়ে ব্যয় করা সম্ভব হয় না। আবার নির্দিষ্ট কোনো খাতে নেওয়া অর্থ অন্য খাতে ব্যয়েরও সুযোগ নেই। ফলে অনেক খাতের টাকা বছরের পর বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংক হিসাবে জমা পড়ে থাকে। সরকার এখন সেই অব্যয়িত অর্থের হিসাব নিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে একজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ভর্তি ও অন্যান্য ফি বাবদ অন্তত ২৫ থেকে ৩০টি খাতে অর্থ নেওয়া হয়। এর মধ্যে কিছু খাতে আদায় করা অর্থ দীর্ঘদিনেও ব্যয় করা সম্ভব হয় না। ফলে এসব অর্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংক হিসাবে অব্যয়িত অবস্থায় পড়ে থাকে।
সম্প্রতি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মাধ্যমে দেশের বড় ২৮টি কলেজ তাদের অব্যয়িত অর্থের হিসাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে অন্য কলেজগুলোকেও তাদের হিসাব জমা দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি অব্যয়িত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কলেজগুলোতে ছাত্র সংসদ কার্যকর না থাকলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২০টি কলেজের ছাত্র সংসদ খাতে ১০ কোটি ২১ লাখ টাকা অব্যয়িত রয়েছে। এ ছাড়া তফসিলভুক্ত বিভিন্ন খাতে আদায় করা অর্থের মধ্যে এসব ২০ প্রতিষ্ঠানে অব্যয়িত রয়েছে ৯২ কোটি ৫৯ লাখ ১৩ হাজার ৪৪৫ টাকা। অর্থাৎ শুধু ওই ২০টি প্রতিষ্ঠানেই অব্যয়িত অর্থের পরিমাণ শতকোটি টাকার বেশি। সব সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে এ অর্থের পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা।
হিসাব জমা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ঢাকার সরকারি বাংলা কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ৩ লাখ ৩৮ হাজার ৩০৬ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ৩ কোটি ১৪ লাখ টাকা অব্যয়িত রয়েছে। কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ৫৬ লাখ ৫১ হাজার ৩৭২ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ১ কোটি ২৮ লাখ ২৫ হাজার ৮৮৯ টাকা রয়েছে।
ঢাকার কবি নজরুল সরকারি কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ৫৮ লাখ ৮৬ হাজার ৩৯৩ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ২ কোটি ৫৩ লাখ ৫৯ হাজার ৫৮৬ টাকা অব্যয়িত রয়েছে। রংপুরের সরকারি কারমাইকেল কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ১ কোটি ২৩ লাখ ২১৯ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ৫ কোটি ২৬ লাখ ৯৩ হাজার ৫১৮ টাকা রয়েছে।
রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ১৬ লাখ ৪০ হাজার ৬৬ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ৩ কোটি ২৬ লাখ ১৯ হাজার ৪৮ টাকা অব্যয়িত রয়েছে। বরিশালের সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ৬০ লাখ ১৬ হাজার ৫৫৬ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ৮৫ লাখ ৫৫ হাজার ৭৬৪ টাকা রয়েছে।
খুলনার সরকারি ব্রজলাল (বিএল) কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ১৪ লাখ ৪১ হাজার ৫৭৬ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ৪ কোটি ৭৬ লাখ ৯১ হাজার ৪৭২ টাকা অব্যয়িত রয়েছে। রাজশাহীর নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ২২ লাখ ২১ হাজার ৮৮৫ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ৩ কোটি ৯৮ লাখ ৯০ হাজার ৩৫৫ টাকা রয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ৩৮ হাজার ৭৪২ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ১ কোটি ১৩ লাখ ৪৯ হাজার ৮৯৪ টাকা অব্যয়িত রয়েছে। বাগেরহাটের সরকারি প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ৫ লাখ ১৫ হাজার ৬০৪ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ১ কোটি ৫০ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯০ টাকা রয়েছে। এ ছাড়া আরও বিভিন্ন কলেজে বিপুল পরিমাণ অব্যয়িত অর্থ রয়েছে।
অব্যয়িত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার উদ্যোগে আপত্তি জানিয়েছেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানরা। তাদের মতে, শিক্ষার্থীদের ভর্তি ও বেতনসহ বিভিন্ন খাত থেকে আদায় করা অর্থের একটি অংশ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হলেও অবশিষ্ট অর্থ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ফান্ডে থাকে। ওই অর্থ শিক্ষার্থীদের কল্যাণ ও প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন প্রয়োজন মেটাতে ব্যয় করা হয়।
প্রতিষ্ঠান প্রধানদের মতে, সব খাতের অর্থ একই অর্থবছরে ব্যয় করা সম্ভব হয় না। কোনো খাতের অর্থ এক বছর অব্যয়িত থাকলেও পরবর্তী বছরে তা প্রয়োজন হতে পারে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানে জনবল কাঠামোর বাইরে খণ্ডকালীন শিক্ষক ও কর্মী নিয়োগ করতে হয়। তাদের বেতনও এসব তহবিল থেকে দিতে হয়।
এ ছাড়া আসবাবপত্র মেরামত, শিক্ষা সফরসহ বিভিন্ন খাতে হঠাৎ করে অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হয়। এসব বিষয় বিবেচনায় না নিয়ে সব অব্যয়িত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে নেওয়া হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন প্রতিষ্ঠান প্রধানরা।
তাদের আরও দাবি, করোনা পরিস্থিতি এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন কারণে অনেক খাতের অর্থ নির্ধারিত সময়ে ব্যয় করা সম্ভব হয়নি। ফলে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অব্যয়িত অর্থের পরিমাণ বেড়েছে। সরকারের উচিত ঢালাওভাবে অর্থ নিয়ে না গিয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিল ব্যবহারে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
কবি নজরুল সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান জানান, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ তাদের কল্যাণেই ব্যয় করা হয়। তবে করোনা ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন কারণে কলেজের কিছু অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয়নি।
তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার শেখানোর জন্য কলেজে একটি ডিজিটাল ফান্ড ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত থাকাকালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ওই ফান্ডে থোক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সেই অর্থও ব্যয় করা হয়নি। বর্তমানে সরকার এসব অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। বিষয়টি বিবেচনার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, অব্যয়িত অর্থ নিয়ে একেকজন একেকভাবে ভাবছেন। সরকার ওই অর্থ নেওয়ার কথা ভাবছে, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠান প্রধানরা তা না দেওয়ার কথা বলছেন।
তিনি বলেন, স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি থাকায় জনবল কাঠামোর বাইরে অনেক সময় খণ্ডকালীন লোক নিয়োগ দিতে হয়। তাদের বেতন বিভিন্ন ফান্ড থেকে দেওয়া হয়। আবার অনেক খাতে হঠাৎ করে ব্যয়ের প্রয়োজন হয়। সরকার সব টাকা নিয়ে গেলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সংকটে পড়তে পারে। তাই টাকা না নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি নীতিমালার আওতায় এনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যেতে পারে।
সার্বিক বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব (নিরীক্ষা) মোহাম্মদ আশরাফুল আলম খান জানান, নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বছরের অব্যয়িত অর্থ প্রতি বছর রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এসব অর্থ জমা দেওয়া হচ্ছে না। এ কারণে অব্যয়িত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার জন্য মাউশির মাধ্যমে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেউ অর্থ জমা না দিলে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।