শ্রীপুরে প্রধান শিক্ষকই কোচিং ব্যবসায়ী! সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষার আড়ালে বাণিজ্য!

মেহেদী হাসান:

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনা জে এম মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আয়েশা সিদ্দিকার বিরুদ্ধে কোচিং বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন সহকারী শিক্ষককে নিয়ে নিয়মিতভাবে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণেই কোচিং পরিচালনা করা হচ্ছে, যা সরকারি নীতিমালার পরিপন্থী।

রোববার (২৬ এপ্রিল) বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষেই কোচিং কার্যক্রম চলছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ৯টা পর্যন্ত প্রথম ধাপে কোচিং নেওয়া হয়। পরে বিদ্যালয় ছুটির পর বিকাল সাড়ে ৪টা থেকে শুরু হয় দ্বিতীয় ধাপের কোচিং। এই কার্যক্রম প্রায় প্রতিদিনই পরিচালিত হচ্ছে।

এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, প্রধান শিক্ষক আয়েশা সিদ্দিকা বিদ্যালয়ের বাইরে পৃথকভাবে একটি কোচিং সেন্টারও পরিচালনা করছেন। সেখানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ বাইরের শিক্ষকদের নিয়োজিত করে নিয়মিত কোচিং বাণিজ্য চালানো হচ্ছে। কয়েক শতাধিক শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন প্রকাশনীর গাইড ও নোটবই অনুসরণ করে পড়ানো হচ্ছে এবং এর বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করা হচ্ছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, কোচিংয়ে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে জনপ্রতি মাসিক ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে, যা অভিভাবকদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বাণিজ্যিকভাবে কোচিং বা প্রাইভেট পড়াতে পারেন না। এ ধরনের কার্যক্রমকে শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রয়েছে।

এ বিষয়ে শ্রীপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ফাতেমা নাসরিন বলেন, “সরকারি শিক্ষকদের প্রাইভেট বা কোচিং পড়ানোর বিষয়ে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

গাজীপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মাসুদ ভূঁইয়া বলেন, “সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কোচিং করানোর কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি নিয়ে আপনারা রিপোর্ট করলে তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তবে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক আয়েশা সিদ্দিকা কোচিং কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “কিছু শিক্ষার্থী দুর্বল হওয়ায় অভিভাবক ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতির সঙ্গে আলোচনা করে কোচিং চালু করা হয়েছে।” তিনি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার কথাও স্বীকার করেন।

অন্যদিকে, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির (এসএমসি) সভাপতি সামান উদ্দিন সাদিক প্রাইভেট বা কোচিংয়ের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।

এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহে গেলে সাংবাদিকদের কাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন ওই বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষকের স্বামী, নিজেকে সমাজকর্মী ও সচেতন নাগরিক হিসেবে পরিচয়দানকারী শফি কামাল। তিনি সাংবাদিকদের উপস্থিতি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাইভেট পড়ানো ‘স্বাভাবিক বিষয়’, তাই এখানে সংবাদকর্মীদের আসার প্রয়োজন নেই। অভিযোগ রয়েছে, তিনি কোচিং বাণিজ্যকে অনিয়ম না মেনে বরং এটিকে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেন। স্থানীয়দের মতে, এ ধরনের আচরণ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, বিদ্যালয়ে পাঠদান কার্যক্রমের মান উন্নয়নের পরিবর্তে কোচিং বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়া শিক্ষার পরিবেশকে ব্যাহত করছে। তারা দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *