অনলাইন ডেস্ক:
একটি সন্তান একটি পরিবারের স্বপ্ন, পরিবারের আমানত এবং শ্রেষ্ঠ সম্পদ। তাই সন্তানের নিরাপত্তা এমনভাবে নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে সে ভালো-মন্দের পার্থক্য বুঝতে পারে, বিপদ আঁচ করতে পারে, ভুল সঙ্গ এড়িয়ে চলতে পারে এবং কোনো সমস্যায় পড়লে নির্ভয়ে মা-বাবার কাছে ফিরে আসতে পারে।
ইসলাম সন্তানের প্রতি মা-বাবার দায়িত্বকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা কর।’ (সুরা : তাহরিম, আয়াত : ৬)
তাই একজন মা-বাবার জন্য শুধু সন্তানের শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; বরং তার দ্বীন, চরিত্র, চিন্তা ও জীবনপথের নিরাপত্তার বিষয়েও সচেতন থাকা জরুরি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৮২৯)
অনেক সন্তান বিপদে পড়লেও মা-বাবাকে কিছু বলতে চায় না। কারণ তারা মনে করে, বিষয়টি জানালে বকুনি, অপমান কিংবা শাস্তি পেতে হবে। ফলে সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে তারা অনেক সময় ভুল মানুষের কাছে আশ্রয় নেয়। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এখানেই মা-বাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে—সন্তানের কাছে এমন একজন আস্থাভাজন মানুষ হয়ে ওঠা, যার কাছে সে ভয় না পেয়ে নিজের কথা বলতে পারে। সন্তান যেন ভুল করলেও কিংবা বিপদে পড়লেও বিষয়টি লুকিয়ে না রেখে মা-বাবার সঙ্গে আলোচনা করতে পারে, সে পরিবেশ পরিবারেই তৈরি করতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) কোমলতার গুরুত্ব বোঝাতে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই কোমলতা যে জিনিসে থাকে, তাকে সুন্দর করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৯৪)
কৈশোরে বন্ধুদের প্রভাব সন্তানের ওপর অত্যন্ত গভীর হয়। একজন ভালো বন্ধু যেমন সন্তানকে ভালো পথে উৎসাহিত করতে পারে, তেমনি খারাপ সঙ্গ তাকে ধীরে ধীরে অনৈতিকতা, মাদক, সহিংসতা কিংবা অপরাধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এ কারণে সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, তার বন্ধুদের আচরণ ও মানসিকতা কেমন—সেদিকেও মা-বাবার নজর রাখা প্রয়োজন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ তার বন্ধুর জীবনাদর্শের ওপর থাকে। অতএব তোমাদের প্রত্যেকে যেন লক্ষ্য করে, সে কাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করছে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮৩৩)
বর্তমান সময়ে সন্তানের নিরাপত্তা শুধু ঘরের বাইরের পরিবেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেম এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মও শিশু-কিশোরদের চিন্তা ও আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। সন্তান কী ধরনের ভিডিও দেখছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে, অপরিচিত কারও সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য বা ছবি শেয়ার করছে কি না—বয়স অনুযায়ী এসব বিষয় খেয়াল রাখা প্রয়োজন।
তবে গোপনে নজরদারির পরিবর্তে সন্তানের সঙ্গে বিশ্বাস ও সচেতনতার সম্পর্ক গড়ে তোলা বেশি জরুরি। সন্তানকে ইন্টারনেট ব্যবহারের ঝুঁকি সম্পর্কে বোঝাতে হবে এবং অনলাইনে কোনো সমস্যায় পড়লে যেন নির্ভয়ে মা-বাবাকে জানাতে পারে, সেই আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
সন্তানের নিরাপত্তার অন্যতম বড় ভিত্তি হলো তার অন্তরে আল্লাহভীতি ও জবাবদিহির অনুভূতি তৈরি করা। যে শিশু ছোটবেলা থেকেই জানে—আল্লাহ তাকে দেখছেন, ভালো কাজের পুরস্কার রয়েছে এবং অন্যায় কাজের জন্য জবাবদিহি করতে হবে—তার বিবেক ও নৈতিক বোধ শক্তিশালী করা সহজ হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দাও।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৫)
তবে সন্তানের নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু মা-বাবার ওপর সীমাবদ্ধ নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রতিবেশী, মসজিদ, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে শিশু-কিশোরদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা।
কোনো এলাকায় মাদক, কিশোর অপরাধ, অস্ত্র, চাঁদাবাজি কিংবা সহিংসতার প্রবণতা দেখা দিলে তা উপেক্ষা না করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো জরুরি। একই সঙ্গে কোনো অপরাধের অভিযোগ উঠলেই যাচাই ছাড়া কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত না করে আইনগত তদন্তের ওপর আস্থা রাখা প্রয়োজন।
সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শাসনের পাশাপাশি ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, নৈতিক শিক্ষা ও পারিবারিক মূল্যবোধের সমন্বয় জরুরি। সন্তান যেন পরিবারকে তার নিরাপদ আশ্রয়স্থল মনে করে—এমন পরিবেশ তৈরি করাই মা-বাবার অন্যতম বড় দায়িত্ব।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সন্তানদের ঈমান, চরিত্র ও জীবনের নিরাপত্তা দান করুন এবং তাদের নেক, নিরাপদ ও কল্যাণময় জীবনের অধিকারী করুন। আমিন।