জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক:
এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল ডিসিপ্লিন কাবাডি। দুই দশক পর এই খেলায় পদক পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল। তবে জাপানের কাছে হারের পর সেই সম্ভাবনা জটিল সমীকরণে আটকে যায়। শেষ পর্যন্ত অন্য ম্যাচের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে থেকেও হিসাব মেলেনি। ফলে পদক ছাড়াই ফিরতে হচ্ছে বাংলাদেশ পুরুষ কাবাডি দলকে।
বাংলাদেশ ‘এ’ গ্রুপে স্বাগতিক জাপান, ভারত, চাইনিজ তাইপে ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে খেলেছে। ভারত চার ম্যাচেই জয় পেয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া সব ম্যাচে হেরেছে। জাপান, চাইনিজ তাইপে ও বাংলাদেশ দুটি করে ম্যাচ জেতায় তিন দলেরই পয়েন্ট দাঁড়ায় চার।
এরপর গ্রুপের হিসাব জটিল হয়ে ওঠে। টুর্নামেন্টের বাইলজ অনুযায়ী, কোনো দল ২৫ শতাংশ পয়েন্ট না পেলে ওই দলের বিপক্ষে ম্যাচের পয়েন্ট গ্রুপের হিসাবের ক্ষেত্রে বিবেচনায় আসে না। দক্ষিণ কোরিয়া কোনো ম্যাচে প্রয়োজনীয় পয়েন্ট অর্জন করতে না পারায় তাদের বিপক্ষে খেলা ম্যাচগুলো বাদ দিয়ে হিসাব করা হয়।
এই হিসাবে ভারত, চাইনিজ তাইপে ও জাপানের বিপক্ষে তিন ম্যাচে বাংলাদেশ ১১০ পয়েন্ট অর্জন করে এবং প্রতিপক্ষকে ১৩৫ পয়েন্ট দেয়। ফলে বাংলাদেশের পয়েন্ট ব্যবধান দাঁড়ায় মাইনাস ২৫।
চাইনিজ তাইপের ক্ষেত্রে তিন ম্যাচে অর্জিত পয়েন্ট ১০২ এবং দেওয়া পয়েন্ট ১১৫। তাদের ব্যবধান মাইনাস ১৩ হওয়ায় বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে সেমিফাইনালে জায়গা করে নেয় তারা। এর মধ্য দিয়ে চাইনিজ তাইপের পদকও নিশ্চিত হয়।
আজ ভারতের বিপক্ষে চাইনিজ তাইপে ৩৭-২১ পয়েন্টে হারে। অন্যদিকে ভারতের কাছে বাংলাদেশের হার ছিল ৪৮-২৫ পয়েন্টে। ফলে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের পরাজয়ের ব্যবধান বেশি হওয়ায় জটিল হিসাবের ক্ষেত্রে আরও পিছিয়ে পড়ে দলটি।
অন্যদিকে স্বাগতিক জাপান দক্ষিণ কোরিয়াকে ৬৫-৩২ পয়েন্টে হারায়। সাধারণ হিসাবে এই ম্যাচে জাপানের ব্যবধান ভালো হলেও দক্ষিণ কোরিয়ার পয়েন্ট না থাকায় ওই ম্যাচটি বাদ দিয়ে হিসাব করা হয়। ফলে জাপানও বাংলাদেশ ও চাইনিজ তাইপেকে টপকাতে পারেনি। তিন ম্যাচে জাপানের অর্জিত পয়েন্ট ৯৪ এবং দেওয়া পয়েন্ট ১২০; ব্যবধান মাইনাস ২৬।
এভাবে খুব কাছ থেকে পদক হাতছাড়া হওয়ায় বাংলাদেশ দলের কোচ আব্দুল জলিল বলেন, জাপানের কাছে হারেই মূলত দল সমীকরণে পিছিয়ে পড়েছিল। চাইনিজ তাইপের বিপক্ষে আরও কিছু পয়েন্ট নিয়ে জয় এবং ভারতের কাছে কম ব্যবধানে হার হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। ভারত চাইনিজ তাইপেকে আরও বড় ব্যবধানে হারালেও বাংলাদেশ সেমিফাইনালে উঠতে পারত বলে জানান তিনি।
তবে চাইনিজ তাইপেকে হারানোর পর বাংলাদেশ দলের উচ্ছ্বাস নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ম্যাচ জয়ের পর কর্মকর্তাদের পতাকা নিয়ে ছবি তুলতে দেখা যায়, যেন পদক নিশ্চিত হয়ে গেছে। অথচ তখনও জাপানের বিপক্ষে ম্যাচ বাকি ছিল। জাপানকে হালকাভাবে নেওয়ার কারণেই মূলত বাংলাদেশ ম্যাচটি হেরেছে—এমন আলোচনা তৈরি হয়।
কোচ আব্দুল জলিলও বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, চাইনিজ তাইপের বিপক্ষে ম্যাচটি পদকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ওই জয়ের বহিঃপ্রকাশ অতিরিক্ত হয়ে গিয়েছিল। দলের ডিফেন্স নিয়েও অনেক ভুগতে হয়েছে এবং জাপানের বিপক্ষে ডিফেন্সই কাল হয়ে দাঁড়ায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে ১৮ জুলাই একযোগে ২৭টি ফেডারেশনের কমিটি পরিবর্তন করা হয়। কাবাডি ফেডারেশনের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ইসরাইল হাওলাদার সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, কয়েকজন খেলোয়াড় পরিবর্তন করতে চাইলেও তা সম্ভব হয়নি। প্রতিপক্ষ দলগুলো বাংলাদেশের তুলনায় আরও বেশি প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি মনে করেন, প্রস্তুতির পাশাপাশি কাবাডিতে আরও আধুনিক কোচিং প্রয়োজন। একই সঙ্গে অন্য খেলাগুলোর মতো কাবাডিতেও যোগ্যতা ও সামর্থ্যের পরিবর্তে কোচদের পছন্দ-অপছন্দের প্রভাব রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দুই কোচ জলিল ও বাদশার মধ্যেও মতানৈক্য রয়েছে।
এশিয়ান গেমসে কাবাডির জন্য অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন সবচেয়ে বেশি অর্থায়ন করেছে। প্রায় অর্ধ কোটি টাকা ব্যয়ে দলটি অনুশীলন করেছে। গেমসের আগে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার পরিকল্পনাও ছিল কাবাডি ফেডারেশনের আগের কমিটির। তবে নতুন কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদেশে টুর্নামেন্ট খেলার সুযোগ হয়নি।
কাবাডি ফেডারেশনের বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক নেওয়াজ সোহাগের সময়েই মূলত এশিয়ান গেমসকে সামনে রেখে দলটির পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের ফলাফল নিয়ে তিনি বলেন, দায়িত্বে থাকাকালে দলগুলোকে যত্নের সঙ্গে প্রস্তুত করার চেষ্টা করা হয়েছিল এবং সব কাজ পেশাদারিত্বের সঙ্গে করার চেষ্টা ছিল। পদক জয়ের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল। তবে প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় তিনি হতাশ।
নেওয়াজ সোহাগের মতে, বাংলাদেশের আরও ইতিবাচক ফলাফল প্রাপ্য ছিল। তবে কেন প্রত্যাশিত ফল হয়নি বা সমস্যাটি কোথায়, সে বিষয়ে মন্তব্য করা তার এখতিয়ারবহির্ভূত বলেও জানান তিনি।