স্টাফ রিপোর্টার:
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় লিখিত চুক্তি ও সালিশি সিদ্ধান্ত অমান্য করে ন্যায্য প্রাপ্য পরিশোধ না করা এবং বন্ধকী সম্পত্তি তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি বা হস্তান্তরের পাঁয়তারা করার অভিযোগ উঠেছে কিফায়েত উল্লাহ নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। এ অভিযোগে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ এবং বিতর্কিত সম্পত্তি নিয়ে সম্ভাব্য ক্রেতা ও ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন ভুক্তভোগী আব্দুল মন্নান।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, সাতকানিয়া উপজেলার ১০ নম্বর কেঁওছিয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম মাদারবাড়ী জনার কেঁওছিয়া এলাকার মৃত লোকমানের ছেলে মো. কিফায়েত উল্লাহর সঙ্গে একই এলাকার আবু তালেবের ছেলে আব্দুল মন্নানের দীর্ঘদিন ধরে সম্পত্তি ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে।
আব্দুল মন্নানের দাবি, কেঁওছিয়া মৌজায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পূর্ব পাশে বাঁশের দোকান সংলগ্ন ‘কিফায়াত টাওয়ার’-এর ২ শতক জমিতে তার বৈধ স্বত্ব ও স্বার্থ রয়েছে। ওই সম্পত্তির আরএস দাগ নম্বর ২৫৪৫ এবং বিএস দাগ নম্বর ৫৮২৮।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০১৯ সালের ১২ ডিসেম্বর কিফায়েত উল্লাহ ও আব্দুল মন্নানের মধ্যে সাক্ষীদের উপস্থিতিতে কিফায়াত টাওয়ারের সেলামি ভিত্তিতে স্থায়ী দোকান বিক্রয় সংক্রান্ত একটি চুক্তিপত্র সম্পাদিত হয়। ওই চুক্তির মাধ্যমে কিফায়েত উল্লাহ আব্দুল মন্নানের কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা গ্রহণ করেন বলে দাবি করা হয়। এর বিনিময়ে কিফায়াত টাওয়ারের নিচতলার উত্তর পাশে পশ্চিমমুখী প্রায় ৭০০ বর্গফুটের একটি দোকান স্থায়ী সেলামি ভাড়ার ভিত্তিতে আব্দুল মন্নানের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এরপর ২০২০ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি কিফায়াত টাওয়ারের দ্বিতীয় থেকে ষষ্ঠ তলা নির্মাণের জন্য কিফায়েত উল্লাহর অর্থের প্রয়োজন হলে আব্দুল মন্নান সেখানে বিনিয়োগে সম্মত হন বলে লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়। এ সময় তিনি কিফায়েত উল্লাহকে ৮০ লাখ টাকা প্রদান করেন বলে দাবি করেন।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, চুক্তি স্বাক্ষরের তারিখ থেকে ১০ বছরের মধ্যে কিফায়েত উল্লাহকে আব্দুল মন্নানের মূল বিনিয়োগের ৮০ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হবে বলে জানানো হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হলে বিনিয়োগের সমপরিমাণ মূল্যের জায়গা ও ফ্ল্যাট আব্দুল মন্নানের নামে সাফ-কবলা রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার শর্তও চুক্তিতে ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
এ নিয়ে পরবর্তীতে উভয় পক্ষের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হলে ২০২১ সালের ২৯ জুলাই আত্মীয়স্বজন ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে একটি সালিশি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে উভয় পক্ষের সম্মতিতে বিরোধ মীমাংসার জন্য বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও শর্ত নির্ধারণ করা হয় বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
সালিশি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কিফায়াত টাওয়ারের দ্বিতীয় থেকে ষষ্ঠ তলা পর্যন্ত অংশ আব্দুল মন্নানের ভোগদখলে থাকার কথা ছিল এবং এ বিষয়ে কিফায়েত উল্লাহ কোনো আপত্তি করতে পারবেন না বলে দাবি করা হয়। একই সঙ্গে চুক্তি বলবৎ থাকা অবস্থায় কিফায়েত উল্লাহ ওই সম্পত্তি কারও কাছে বিক্রি, বন্ধক, দান বা হেবা করতে পারবেন না এবং ব্যাংক ঋণের জন্য সম্পত্তিটি বন্ধক রাখতে পারবেন না—এমন সিদ্ধান্তও সালিশে হয়েছিল বলে জানানো হয়।
আব্দুল মন্নানের অভিযোগ, এসব চুক্তি ও সালিশি সিদ্ধান্তের পরও কিফায়েত উল্লাহ সম্পত্তিটি অন্যের কাছে হস্তান্তর এবং বিভিন্ন ব্যাংকে বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ২০২৩ সালে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে নালিশি সম্পত্তিটি বন্ধকী ঋণের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছিল বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়। বিষয়টি জানতে পেরে তিনি তা বাতিলের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন বলে জানান।
এছাড়া বিতর্কিত সম্পত্তি নিয়ে সম্ভাব্য ক্রেতা ও সাধারণ মানুষকে সতর্ক করতে দেশের দুটি জাতীয় দৈনিক—দৈনিক প্রথম আলো ও দৈনিক আজাদীতে সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। একই সঙ্গে কোনো ধরনের প্রতারণামূলক বা জালিয়াতিপূর্ণ হস্তান্তর ঠেকাতে সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে রেজিস্ট্রি স্থগিত রাখার আবেদন করা হয়েছে বলে দাবি করেন আব্দুল মন্নান।
সংবাদ সম্মেলনে আব্দুল মন্নানের পক্ষে তিনটি প্রধান দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—কিফায়েত উল্লাহ যেন আব্দুল মন্নানের স্বত্ব ও অধিকার ক্ষুণ্ণ করে কিফায়াত টাওয়ারের কোনো অংশ তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি, দান, হেবা বা হস্তান্তর করতে না পারেন এবং কোনো ব্যাংকে বন্ধক রেখে ঋণ নিতে না পারেন।
দ্বিতীয়ত, সালিশি বৈঠকের সিদ্ধান্ত ও লিখিত চুক্তির শর্ত অনুযায়ী আব্দুল মন্নানের মূল বিনিয়োগের টাকা দ্রুত পরিশোধ অথবা তার প্রাপ্য অংশ রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
তৃতীয়ত, বিতর্কিত সম্পত্তিতে কোনো সাধারণ মানুষ বা সম্ভাব্য ক্রেতা যাতে বিনিয়োগ করে প্রতারিত না হন, সে জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয় এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষের জরুরি আইনগত হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আব্দুল মন্নান বলেন, লিখিত চুক্তি ও সালিশি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তার যে অধিকার ও পাওনা রয়েছে, তা নিশ্চিত করতে তিনি দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করছেন। কিন্তু তার অভিযোগ, পাওনা পরিশোধ না করে এবং সম্পত্তির বিষয়ে সমাধান না করে কিফায়েত উল্লাহ অন্যত্র সম্পত্তি হস্তান্তরের চেষ্টা করছেন। এ কারণে তিনি প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা এবং ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছেন।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে কিফায়েত উল্লাহর বক্তব্য জানতে বিভিন্নভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানা যায়নি।