রায়পুর প্রতিনিধি:
লক্ষ্মীপুরে উন্নয়নকাজের বিল ছাড়াতে ৫ শতাংশ কমিশন আদায়, অসম্পূর্ণ ভবনের বিপরীতে প্রায় ৩৩ কোটি টাকার বিল পরিশোধ এবং সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারসহ একাধিক অভিযোগ উঠেছে সদর উপজেলা প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের মধ্যেই ২০ দিনের ব্যবধানে তিন দফা বদলির পর আবারও লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায় একই পদে বহাল হয়েছেন তিনি।
স্থানীয় ঠিকাদারদের অভিযোগ, এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনকে ‘ম্যানেজ’ করে বদলি আদেশ বাতিল করিয়ে নিজ পদে ফিরেছেন লক্ষ্মীপুরের নিজ জেলার বাসিন্দা ইকবাল হোসেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দাপ্তরিক নথিপত্র অনুযায়ী, গত ৩১ আগস্ট এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে (স্মারক নং-৯৫৩৫) ইকবাল হোসেনকে ফেনীর পরশুরাম উপজেলায় বদলি করা হয়। এর এক সপ্তাহের মধ্যে তাঁকে পরশুরাম থেকে সরিয়ে চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার সহকারী প্রকৌশলী করা হয়। এরপর মাত্র ১০ দিনের মাথায় ২১ সেপ্টেম্বর প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেনের স্বাক্ষরিত আরেকটি অফিস আদেশে (স্মারক নং-১০১৪৭) আগের বদলি আদেশ বাতিল করে ইকবাল হোসেনকে পুনরায় লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায় বহাল করা হয়।
এদিকে বরিশালের মুলাদী থেকে বদলি হয়ে আসা কর্মকর্তা মো. জিয়াউল হককে প্রথমে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায় বদলি করা হয়েছিল। তবে তিনি দায়িত্ব নিতে গেলে ইকবাল হোসেন তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে অফিস থেকে বের করে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে ২১ সেপ্টেম্বর জারি করা আরেক অফিস আদেশে (স্মারক নং-১০১৪৬) জিয়াউল হকের আগের বদলি আদেশ সংশোধন করে তাঁকে চন্দ্রগঞ্জ উপজেলায় পাঠানো হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পিটিআই প্রকল্পের অসম্পূর্ণ কাজের বিপরীতে শতভাগ বিল পরিশোধের বিষয়টি ধামাচাপা দিতে নতুন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব নিতে বাধা দেওয়া হয়েছে। এ কারণেই ইকবাল হোসেন সদর উপজেলার পদ ধরে রাখার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ তাঁদের।
লক্ষ্মীপুর সরকারি প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (পিটিআই) পাঁচতলা একাডেমিক ভবন ও মহিলা হোস্টেল নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগে কয়েক দিন ধরে আলোচনা চলছে। মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, ভবন দুটির আস্তর, রং, টাইলস, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও আসবাবপত্রের বিভিন্ন কাজ এখনো অসম্পূর্ণ রয়েছে।
দুটি প্রকল্পের চুক্তিমূল্য ৩৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে ইতোমধ্যে প্রায় ৩৩ কোটি ১৯ লাখ টাকার শতভাগ বিল ছাড় করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কাজ শেষ হওয়ার আগেই শতভাগ বিল নেওয়ার বিষয়টি ঠিকাদার বেলাল হোসেন ও এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল চৌধুরী স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া নির্মাণাধীন মসজিদ, পুকুরঘাট, কালভার্ট ও গভীর নলকূপের বিল পাসের জন্য ৫ শতাংশ কমিশন আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে গত ১৫ জুলাই এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এএসএম মহসীনকে নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় (স্মারক নং-৭২৫৯)। তবে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই অভিযুক্ত কর্মকর্তা প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
দপ্তরের কয়েকজন কর্মচারীর অভিযোগ, ইকবাল হোসেন কথায় কথায় অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করেন। এতে পুরো অফিসে একধরনের ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলেও তাঁরা দাবি করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার বলেন, প্রধান প্রকৌশলীকে ‘ম্যানেজ’ করে ২০ দিনের মধ্যে আবার সদর উপজেলায় ফিরে আসায় ইকবাল হোসেন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। তাঁকে দ্রুত অপসারণ এবং অভিযোগের তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে উপজেলার উন্নয়নকাজ ব্যাহত হতে পারে বলে তাঁদের আশঙ্কা।
এ ছাড়া সরকারি চাকরির বিধিমালা অনুযায়ী নিজ জেলায় কোনো কর্মকর্তার পদায়ন বা দায়িত্ব পালনের সুযোগ নেই বলে দাবি করা হয়েছে। ইকবাল হোসেনের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার ৫ নম্বর চরপাতা ইউনিয়নের চরপাতা গ্রামে। তিনি নিজ জেলার সদর উপজেলায় প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় বিধিমালা লঙ্ঘন হচ্ছে এবং এর ফলে স্থানীয়ভাবে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর লক্ষ্মীপুর সভাপতি কামাল হোসেন বলেন, কাজ অসম্পূর্ণ রেখে শতভাগ বিল পরিশোধ এবং কমিশন বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেনকে কার্যালয়ে পাওয়া যায়নি। তাঁর ব্যবহৃত দুটি মুঠোফোনও বন্ধ পাওয়া যায়। এর আগে তিনি অভিযোগকারীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘যে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে, সে অপরাধী। ভালো লোক না। আমিও এসব বিষয়ে দেখছি।’
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।