অভিবাসী পরিবারের সন্তান থেকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন: ইয়ামাল-নিকোদের অনুপ্রেরণার গল্প

স্পোর্টস ডেস্ক ::

স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ের পেছনে শুধু ফুটবল নয়, আছে সংগ্রাম, ত্যাগ আর স্বপ্নপূরণের এক অসাধারণ ইতিহাস। লামিনে ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামস—দুই তরুণ তারকার উত্থান আজ বিশ্বজুড়ে আলোচিত। কিন্তু তাদের সাফল্যের পেছনে রয়েছে আফ্রিকা থেকে ইউরোপে অভিবাসী হয়ে আসা দুই পরিবারের কঠিন জীবনসংগ্রাম, যা আজ লাখো অভিবাসী পরিবারের জন্য অনুপ্রেরণার প্রতীক।

বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ১৬ বছর পর শিরোপা জয়ের আনন্দে ভাসছে স্পেন। তবে ট্রফি জয়ের উচ্ছ্বাসের মধ্যেও সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে নিকো উইলিয়ামসের বড় ভাই ইনিয়াকি উইলিয়ামসের আবেগঘন বার্তা।

নিজের ইনস্টাগ্রামে ইনিয়াকি লিখেছেন, “তুমি শুধু বিশ্বকাপ জেতোনি, লাখো অভিবাসী পরিবারকে স্বপ্ন দেখার সাহস দিয়েছ। আমাদের বাবা-মায়ের মতো মানুষদের বিশ্বাস করিয়েছ যে, একদিন তাদের সন্তানরাও নিজেদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে।”

তিনি আরও লেখেন, “এটি শুধু আমাদের পরিবারের গল্প নয়; এটি তাদের সবার গল্প, যারা উন্নত জীবনের আশায় সবকিছু ছেড়ে নতুন দেশে পাড়ি জমায়। কঠোর পরিশ্রম আর নিষ্ঠা থাকলে অসম্ভবও সম্ভব—তুমি সেটাই প্রমাণ করেছ।”

সাহারা পেরিয়ে ইউরোপে

ঘানার বাসিন্দা নিকো ও ইনিয়াকির বাবা ফেলিক্স উইলিয়ামস এবং মা মারিয়া আর্থার উন্নত জীবনের আশায় ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে ইউরোপের উদ্দেশে রওনা হন। তাদের যাত্রাপথ ছিল অত্যন্ত ভয়ংকর।

খাবার ও পানির সংকটের মধ্যেই পায়ে হেঁটে সাহারা মরুভূমির বিস্তীর্ণ অংশ অতিক্রম করেন তারা। পরে দুই ভাই জানতে পারেন, সেই কঠিন যাত্রায় তাদের মা অন্তঃসত্ত্বা এবং খালি পায়ে ছিলেন।

স্পেনের উত্তর আফ্রিকান শহর মেলিয়ায় পৌঁছানোর পর তারা আটক হন। পরে একজন আইনজীবীর সহায়তায় রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেন। আশ্রয় পাওয়ার পর তাদের বিলবাওয়ে পাঠানো হয়, যেখানে স্থানীয় এক ধর্মযাজক তাদের পাশে দাঁড়ান। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অংশ হিসেবে বড় ছেলের নাম রাখা হয় ইনিয়াকি

পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে বাবা ফেলিক্স পরে ইংল্যান্ডে চলে যান। লন্ডনে ফুড কোর্টে টেবিল পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে নিরাপত্তারক্ষীর কাজ—যা পেয়েছেন, তাই করেছেন। অন্যদিকে মা একসঙ্গে একাধিক কাজ করে সংসার চালিয়েছেন।

নিকো এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “ইনিয়াকি শুধু আমার ভাই নয়, আমার কাছে বাবার মতো। ছোটবেলায় আমার খাবার, স্কুল, পোশাক—সবকিছুর দায়িত্ব সে নিয়েছিল।”

২০২১ সালে অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের জার্সিতে একই ম্যাচে মাঠে নেমে ইতিহাস গড়েন দুই ভাই। পরে ইনিয়াকি ঘানার জাতীয় দল বেছে নিলেও নিকো স্পেনের হয়ে খেলেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

দাদির হাত ধরে স্পেনে ইয়ামালের পরিবারের যাত্রা

স্পেনের আরেক তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামালের গল্পও কম নাটকীয় নয়।

ইয়ামালের বাবা মুনির নাসরাউই মরক্কোর এবং মা শেইলা এবানা ইকুয়েটোরিয়াল গিনির বাসিন্দা। তবে তাদের পরিবারের স্পেনে আসার পথ তৈরি করেছিলেন ইয়ামালের দাদি ফাতিমা রোমানি নাসরাউই।

একাই মরক্কো ছেড়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কাতালোনিয়ার মাতারো শহরে পৌঁছেছিলেন তিনি। সেখানে কঠোর পরিশ্রম করে সন্তানদের স্পেনে নিয়ে আসার মতো অর্থ জোগাড় করেন। পরে ইয়ামালের বাবা-মায়ের পরিচয় হয় এবং তারা বার্সেলোনার উপকণ্ঠে বসবাস শুরু করেন।

পরিবারের সবচেয়ে কঠিন সময়ে যারা সহায়তা করেছিলেন, তাদের দুজনের নাম মিলিয়েই সন্তানের নাম রাখা হয় লামিনে ইয়ামাল

দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হওয়া ইয়ামালের শৈশব কেটেছে বার্সেলোনার উপকণ্ঠের সাধারণ এলাকায়। সেখানকার সিমেন্টের মাঠেই ফুটবলের হাতেখড়ি। মাত্র ছয় বছর বয়সে তিনি যোগ দেন বার্সেলোনার বিখ্যাত যুব একাডেমি লা মাসিয়ায়।

২০২৩ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে স্পেন জাতীয় দলে অভিষেক ও গোল করে ইতিহাস গড়েন ইয়ামাল। এরপর ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের পর এবার বিশ্বকাপও জিতে স্পেনের নতুন প্রজন্মের অন্যতম সেরা তারকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

আজ ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামস শুধু বিশ্বচ্যাম্পিয়ন নন; তারা প্রমাণ করেছেন, অভিবাসী পরিবারের সন্তান হয়েও কঠোর পরিশ্রম, আত্মত্যাগ ও স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে বিশ্বের সর্বোচ্চ মঞ্চে সফল হওয়া সম্ভব।

সূত্র: বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *