আমতল সিডিএ মার্কেটে পার্কিং দখল করে ১৬০ দোকান, নকশাবহির্ভূত নির্মাণের অভিযোগ

কামরুল ইসলাম:

চট্টগ্রাম নগরের রিয়াজউদ্দিন বাজারের আমতল এলাকায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) বরাদ্দ দেওয়া একটি বাণিজ্যিক ভবনের পার্কিংয়ের জায়গা দখল করে ১৬০টি দোকান নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। আটতলা ভবনটির বিভিন্ন অংশে নকশাবহির্ভূত নির্মাণকাজ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে ভবনটিতে পর্যাপ্ত চলাচলের জায়গা না থাকায় এবং অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

নকশাবহির্ভূত নির্মাণের অভিযোগে নগরের বিভিন্ন ভবনের বর্ধিত অংশ ভেঙে দিচ্ছে সিডিএ। বিভিন্ন স্কুল ও বেসরকারি হাসপাতাল পরিদর্শন করে ভবনগুলোতে পর্যাপ্ত পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখার তাগিদও দিয়েছেন সিডিএ চেয়ারম্যান। অথচ সিডিএর বরাদ্দ দেওয়া আমতল এলাকার এই বাণিজ্যিক ভবনের পার্কিংয়ের জায়গাতেই দোকান নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিডিএ চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে নকশাবহির্ভূত ভবনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালসহ সব স্থাপনাকে নিয়মের মধ্যে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে আমতল সিডিএ মার্কেটের অনিয়ম খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

২০৪ হকারের নামে বরাদ্দ, পুনর্বাসন হয়নি

আমতল থেকে নিউ মার্কেট হয়ে পুরাতন রেলস্টেশন পর্যন্ত সড়কের দুই পাশ দীর্ঘদিন ধরে কয়েকশ হকারের দখলে রয়েছে। এতে ওই এলাকায় দিন-রাত যানজট লেগেই থাকে। হকারদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ২০০১ সালে আমতল এলাকায় সিডিএ হকার্স মার্কেট নির্মাণ করা হয়। মার্কেটটির নাম দেওয়া হয় ‘সিডিএ নিউ হকার্স মার্কেট ক্ষুদ্র দোকানদার সমবায় সমিতি লি.’।

মার্কেটের জমি ২০৪ জন হকারের নামে বরাদ্দ দেওয়া হলেও অভিযোগ রয়েছে, সেখানে প্রকৃতপক্ষে কোনো হকারকে পুনর্বাসন করা হয়নি। বরং সড়কের ওপর এখনও তিন সারিতে হকার বসে ব্যবসা করছেন।

পার্কিংয়ের জায়গায় ১৬০ দোকান

২০০১ সালের ২২ নভেম্বর ভবন নির্মাণের অনুমতিপত্রে ১৫টি শর্ত দেওয়া হয়। এর মধ্যে ১০ নম্বর শর্তে বলা হয়েছে, নকশায় দেখানো জায়গা ছাড়া অন্য কোথাও গাড়ি রাখা যাবে না। একই সঙ্গে পার্কিংয়ের খালি জায়গায় কোনো ধরনের দোকান বা ইমারত নির্মাণ না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

১৩ নম্বর শর্তে ভবনের প্রতিটি তলায় অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতি প্রকাশ্য স্থানে ব্যবহারবিধি লিপিবদ্ধ করে স্থাপনের কথা বলা হয়েছে।

তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, আমতল সিডিএ মার্কেটে বর্তমানে পার্কিংয়ের কোনো জায়গা নেই। পার্কিংয়ের জায়গা দখল করে প্রায় ১৬০টি দোকান নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব দোকানের প্রতিটি কোটি টাকায় বিক্রি করা হয়েছে বলে স্থানীয় একাধিক দোকানদার দাবি করেছেন।

তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় ২০৪টি করে দোকান রয়েছে। এছাড়া চতুর্থ তলা থেকে প্রতি ফ্লোরে ৫২টি করে দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক দোকানদারের অভিযোগ, পার্কিংয়ের জায়গায় দোকান নির্মাণ ও বিক্রি করে সংশ্লিষ্টরা শত কোটি টাকা আয় করেছেন।

নেই পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা

অভিযোগ রয়েছে, আটতলা ভবনটির প্রতিটি তলায় অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র রাখার কথা থাকলেও তা যথাযথভাবে রাখা হয়নি। একইভাবে লিফট ও এসকেলেটরের জন্য নির্ধারিত স্থানও নেই বলে দাবি করা হয়েছে। ভবনের সিঁড়িগুলোও অত্যন্ত সরু। ফলে কোনো ধরনের অগ্নিকাণ্ড বা জরুরি পরিস্থিতিতে ভবন থেকে দ্রুত বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মার্কেটের ভেতরে প্রবেশ করলে পর্যাপ্ত জায়গার অভাবে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করাও কঠিন বলে অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা।

‘নকশা গায়েব’ করার অভিযোগ

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিডিএর একাধিক কর্মকর্তা জানান, মার্কেটটির নকশা সিডিএর অথরাইজড বিভাগের কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক আগেই নকশাটি গায়েব করা হয়েছে বলে দাবি করেন তারা।

তাদের অভিযোগ, মার্কেটটির নতুন কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর ধাপে ধাপে ভবনের ওপরের অংশ নির্মাণ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই ভবনটির নির্মাণকাজ চলেছে। এ কাজে সিডিএর কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীও জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন তারা। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

নির্মাণকারীদের বক্তব্য

জানা যায়, মার্কেটটির পার্কিং থেকে দ্বিতীয় তলা পর্যন্ত নির্মাণ করেছিলেন মোহাম্মদ মোতালেব চৌধুরী। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মার্কেটের জায়গাটি সিডিএ থেকে ২০৪ জনের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। পার্কিং ও দ্বিতীয় তলা পর্যন্ত তিনি নির্মাণ করেছেন।

তিনি আরও জানান, ২০১৬ সালে দ্বিতীয় তলা থেকে অষ্টম তলা পর্যন্ত নির্মাণ করেন সেলিম উল্লাহ। পার্কিংয়ের জায়গায় দোকান নির্মাণ করা হয়েছে—এটি সত্যি বলেও স্বীকার করেন তিনি। তবে অন্যান্য তলায় নকশাবহির্ভূত কাজ সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণা নেই বলে জানান।

এ বিষয়ে সেলিম উল্লাহর বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

মামলা চলমান: সিডিএ

সিডিএর অথরাইজড অফিসার তানজীব হোসেন বলেন, ‘আমি যতটুকু শুনেছি, এ মার্কেট নিয়ে একটি মামলা চলমান রয়েছে। মামলা-সংক্রান্ত বিষয়গুলো আমাদের আইন শাখা দেখে। তাই এ বিষয়ে তারাই ভালো জানবে।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পার্কিংয়ের জায়গা দখল, নকশাবহির্ভূত নির্মাণ এবং অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তারা দ্রুত মার্কেটটির অনুমোদিত নকশা যাচাই, অবৈধ স্থাপনা অপসারণ, পার্কিংয়ের জায়গা উদ্ধারের পাশাপাশি অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *