মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন:
খুলনায় শিশু কল্যাণ খাতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা ও কল্যাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প নিয়ে ওঠা অভিযোগ এখন জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
সূত্রগুলো জানায়, খুলনা বিভাগীয় শিশু হাসপাতাল সম্প্রসারণ প্রকল্পটি ২০১৭ সালে অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রায় ১১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নের কথা থাকলেও দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও এখনো প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়া এবং কার্যক্রম শুরু করতে ব্যর্থ হওয়ায় এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্মাণকাজে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে এবং একাধিক পর্যায়ে অতিরিক্ত বিল দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে।
এছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে। ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রকল্প ব্যয়ের বড় একটি অংশ অনিয়মের মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এসব অনিয়মের কারণে প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য, অর্থাৎ শিশুদের জন্য আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করা, এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।
অন্যদিকে, হাসপাতালটির কার্যকারিতা নিয়ে আরও একটি বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে জনবল সংকটের কারণে। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্টাফ নিয়োগ না হওয়ায় অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হলেও হাসপাতালটি কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে খুলনা অঞ্চলের অসংখ্য শিশু উন্নত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা স্থানীয় জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
এদিকে খুলনা জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসক মো. হুসাইন শওকতের বিরুদ্ধেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়, দায়িত্ব পালনকালে তিনি এক বছরে মাত্র ১০ দিন অফিসে উপস্থিত ছিলেন। প্রশাসনিক দায়িত্বে দীর্ঘ অনুপস্থিতি সত্ত্বেও তার নামে বিভিন্ন নথিপত্র, বিল ও চেক স্বাক্ষরের কাজ পরিচালিত হতো বলে জানা গেছে। এসব নথি অনেক সময় বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে পাঠিয়ে স্বাক্ষর সম্পন্ন করা হতো, যা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, খুলনা শিশু হাসপাতাল সম্প্রসারণ প্রকল্পসহ মোট ১০টি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা, প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের অর্থ ব্যয়, টেন্ডার প্রক্রিয়া, বিল-ভাউচার এবং কাজের বাস্তব অগ্রগতি বিস্তারিতভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
দুদকের এই অনুসন্ধানকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক মহলেও আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে চলমান এসব প্রকল্পে যদি সত্যিই অনিয়ম প্রমাণিত হয়, তবে এটি শুধু আর্থিক দুর্নীতির বিষয় নয়, বরং জনস্বাস্থ্য ও শিশু কল্যাণ খাতে গুরুতর অব্যবস্থাপনার একটি উদাহরণ হিসেবে সামনে আসবে।
সুশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু কল্যাণ ও স্বাস্থ্যসেবার মতো সংবেদনশীল খাতে এ ধরনের অনিয়ম অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তারা মনে করেন, দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন অনিয়ম প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও তারা গুরুত্ব দিয়েছেন।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা আশা প্রকাশ করেছেন, দুদকের চলমান অনুসন্ধানের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে। পাশাপাশি এই ধরনের তদন্ত ভবিষ্যতে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে বলে তারা মনে করছেন।