মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন:
খুলনা ও যশোর অঞ্চলে সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি এখন অনিয়ম, দুর্নীতি আর সিন্ডিকেটের কবলে। ২০২৫ সাল জুড়ে এ অঞ্চলের খাদ্য বিভাগকে কেন্দ্র করে ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব, চালের ওজনে কারচুপি, নিম্নমানের খাদ্যশস্য বিতরণ এবং সরকারি গুদাম থেকে চাল চুরির অসংখ্য চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একাধিক অভিযান ও স্থানীয় গণমাধ্যমে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কারণে পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি।
ডিলার নিয়োগে টাকার খেলা ও রাজনৈতিক প্রভাব
২০২৫ সালের মে মাসে যশোরের মনিরামপুর উপজেলায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির জন্য ৪৬ জন নতুন ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে চরম ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রতিটি ডিলারশিপের জন্য গড়ে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত অবৈধ লেনদেন হয়েছে। এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার তোয়াক্কা না করে স্থানীয় রাজনৈতিক মেরুকরণকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। বঞ্চিত প্রার্থীদের দাবি, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের মাধ্যমে ৩৬ জন এবং অন্য একটি দলের ৭ জনকে ডিলার হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এই তালিকা বাতিলের দাবি জানানো হলেও কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
ওজনে কম ও নিম্নমানের চাল সরবরাহ
শার্শা উপজেলার কায়বা ইউনিয়নে মার্চ মাসে চাল বিতরণের সময় কার্ডধারীরা সরাসরি ওজনে কম দেওয়ার অভিযোগ তোলেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতি কার্ডে ৩০ কেজি চাল দেওয়ার কথা থাকলেও দরিদ্র মানুষদের দেওয়া হয়েছে মাত্র ২৫-২৬ কেজি। শুধু শার্শা নয়, ঝিকরগাছা ও কেশবপুর অঞ্চলেও একই চিত্র দেখা গেছে। অন্যদিকে, আটা মিল মালিকদের একটি অসাধু চক্র নিম্নমানের আটা সরবরাহ করে সরকারি বরাদ্দের বড় একটি অংশ খোলা বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। খুলনা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে এই সিন্ডিকেটকে সুবিধা দেওয়ার গুঞ্জনও এখন মুখে মুখে।
গুদামে চাল চুরি ও দুদকের অভিযান
যশোরের নাভারণ সরকারি খাদ্য গুদামে ২০২৫ সালে দুদক বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে দেখা যায়, খাতা-কলমে মজুদ ঠিক থাকলেও বাস্তবে প্রায় ৩৫ মেট্রিক টন চালের কোনো হদিস নেই। ৪, ৫ ও ৬ নম্বর গুদামে মজুদ রাখা হয়েছে খাওয়ার অযোগ্য লালচে ও দুর্গন্ধযুক্ত চাল। গুদাম রক্ষক জামশেদ ইকবালুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি রাতের আঁধারে ভালো মানের চাল সরিয়ে উত্তরাঞ্চল থেকে কম দামে কেনা নিম্নমানের চাল দিয়ে গুদাম পূর্ণ করেন। এছাড়া ১,৫০০ খালি বস্তার ঘাটতিও দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
অনুরূপভাবে মাগুরার শালিখা উপজেলার আড়পাড়া খাদ্য গুদাম থেকে ১৯০ মেট্রিক টন চাল ও ২২ হাজার খালি বস্তা লুটের ঘটনাটিও ছিল আলোচনার তুঙ্গে। এই ঘটনায় যশোরের খাদ্য কর্মকর্তা সালমা চৌধুরীর নাম জড়িয়ে পড়লে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, ১ কোটি ১৫ লাখ টাকার এই লুটপাটের ঘটনাটি বিশেষ লবিংয়ের মাধ্যমে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
প্রভাব ও কর্তৃপক্ষের ভূমিকা
তৃণমূল পর্যায়ে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির উপকারভোগীদের তালিকা হালনাগাদ করা হলেও প্রকৃত দরিদ্ররা সুবিধা পাচ্ছেন না। মিল মালিক ও কর্মকর্তাদের কমিশন বাণিজ্যের কারণে সরকারের মহৎ এই উদ্যোগ ভেস্তে যাচ্ছে। স্থানীয় পত্রিকা দৈনিক স্বাধীন সংবাদ ও আজকের পত্রিকার নিয়মিত প্রতিবেদনে এসব চিত্র উঠে এলেও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা সাধারণ মানুষকে হতাশ করছে।
খুলনা আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানানো হয়েছে, অনিয়মের অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে ভুক্তভোগীদের দাবি, তদন্তের নামে দীর্ঘসূত্রিতা না করে অভিযুক্ত ডিলার ও কর্মকর্তাদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। অন্যথায় এ অঞ্চলের খাদ্য নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে।