গণপূর্তের ‘দুর্নীতিবাজ’ তাজুলের ফাইল নিয়ে গড়িমসি

এইচ এম হাকিম:

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কড়া নির্দেশ, ১৫ কর্মদিবসের আলটিমেটাম—কিছুই যেন স্পর্শ করতে পারছিল না গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ সার্কেল, ঢাকা-এর উচ্চমান সহকারী মোঃ তাজুল ইসলামের অদৃশ্য ক্ষমতার খুঁটিকে। সাবেক কেন্দ্রীয় সচিবালয় (এনএসআই) সংলগ্ন ৫১টি সরকারি ঘর দখল করে মাসে লাখ লাখ টাকার ‘ভাড়া বাণিজ্য’, আদালতের চালকদের কক্ষ দখল এবং সরকারের লাখ লাখ টাকার রাজস্ব ক্ষতি করার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকার পরও ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছিল তদন্ত প্রক্রিয়া। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ নিয়ে অধিদপ্তরের একশ্রেণির কর্মকর্তার রহস্যজনক ‘ইঁদুর-বিড়াল খেলা’ এবং তদন্ত কমিটি বাতিল ও গড়িমসি নিয়ে সংবাদমাধ্যমে একের পর এক বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশের পর অবশেষে টনক নড়েছে প্রশাসনের। গত ১১ জুন ২০২৬ তারিখে ৩ সদস্যের একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠন করতে বাধ্য হয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তর।

নেপথ্যে ক্ষমতার দাপট ও গড়িমসির নাটক

অনুসন্ধানে জানা যায়, গণপূর্তের এই ‘আলাদিনের চেরাগ’ হাতে পাওয়া কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির সচিত্র খতিয়ান সংবাদমাধ্যমে আসার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এরই প্রেক্ষিতে গত ৩০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে জনৈক মেহেদী রশীদ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে গত ১৮ মে ২০২৬ তারিখে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অধিশাখা-৮ (স্মারক নম্বর: ২৫.০০.০০০০.০১৪.৯৯.০০৬.১৯-৩১৪) থেকে উপসচিব মোছাঃ লুৎফুন নাহার নাজিম স্বাক্ষরিত এক আদেশে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সরেজমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ‘নির্দেশক্রমে অনুরোধ’ করা হয়।

কিন্তু এই নির্দেশ পাওয়ার পর সংস্থাপন বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) মুহাম্মাদ সারোয়ার জাহানের দপ্তর থেকে তদন্তে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। নির্ধারিত ১৫ কর্মদিবস পার হওয়ার পর সাংবাদিকরা যোগাযোগ করলে তিনি দাবি করেন, একটি কমিটি গঠন করা হলেও কাজের চাপের অজুহাতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা অপরাগতা প্রকাশ করায় তা বাতিল করা হয়েছে।

সংবাদের আঘাতে অবশেষে টনক নড়ল প্রশাসনের

তদন্ত কমিটি নিয়ে এই লুকোচুরি ও গড়িমসির খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হওয়া মাত্রই অধিদপ্তরের ভেতরে-বাইরে তোলপাড় শুরু হয়। সমালোচনার মুখে পড়ে সংস্থাপন শাখা। অবশেষে এই ‘টাকা ও ক্ষমতার সিন্ডিকেট’ ভাঙতে বাধ্য হন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। সংবাদ প্রকাশের পরদিনই, অর্থাৎ ১১ জুন ২০২৬ তারিখে (স্মারক নম্বর: ২৫.৩৬.০০০০.০০০.২২০.২৭.০০৫২.২৬.১৯৯) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মাদ সারোয়ার জাহান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে ৩ সদস্যের নতুন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

গণপূর্ত ডিজাইন সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. মুহম্মদ শারফুদ্দীনকে এই কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। এছাড়া নির্বাহী প্রকৌশলী (সংস্থাপন-২) জনাব মোঃ জিয়াউড় রহমান এবং উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (প্রকিউরমেন্ট) জনাব মোঃ আলী হোসেনকে কমিটিতে সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ১০ (দশ) কর্মদিবসের মধ্যে সরেজমিনে তদন্তপূর্বক সুস্পষ্ট মতামতসহ বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দখলদারিত্ব ও লুটপাটের খতিয়ান

অভিযোগের বিবরণ অনুযায়ী, মোঃ তাজুল ইসলাম ২০১১ সাল থেকে সুদীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে গণপূর্তে একচ্ছত্র সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগগুলো হলো—

সরকারি আবাসন ও ভাড়া বাণিজ্য:
সাবেক এনএসআই ভবন সংলগ্ন ৫১টি সরকারি ঘর অবৈধভাবে দখল করে প্রতি মাসে প্রায় ৫,০০,০০০ (পাঁচ লাখ) টাকা ভাড়া পকেটে ভরছেন তিনি, যার কোনো অংশ সরকারি কোষাগারে জমা হয় না।

রাজস্ব ক্ষতি ও আদালতের জায়গা দখল:
১ নম্বর ১২ তলা ভবনের পূর্ব পাশের টিনশেড দখল করে বসবাস করায় গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল বাবদ সরকারের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২২,৬২,০০০ টাকা। এছাড়া ১ নম্বর কোর্ট অব সেটেলমেন্ট এলাকায় আদালতের গাড়িচালকদের নির্ধারিত কক্ষ দখল করে বিচারিক কাজে বিঘ্ন ঘটাচ্ছেন তিনি।

ক্যান্টিন সিন্ডিকেট:
পূর্ত ভবনের ক্যান্টিন বরাদ্দ বাবদ এককালীন ৫,০০,০০০ টাকা ঘুষ এবং মাসিক ৩৫,০০০ টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

অবৈধ সম্পদের পাহাড়:
এই চাঁদাবাজি ও ভাড়ার টাকায় রাজধানীর নন্দীপাড়ায় ১০ কাঠা জমির ওপর তার একটি বহুতল ভবন নির্মাণাধীন রয়েছে।

নজর এখন তদন্ত কমিটির দিকেই

অতীতেও নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত ৩ সদস্যের একটি কমিটি তাজুলের দুর্নীতির সত্যতা পেয়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করলেও রহস্যজনক কারণে তা ধামাচাপা পড়ে যায়। সচেতন মহল ও গণপূর্তের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—সংবাদমাধ্যমের চাপে এবার কমিটি গঠিত হলেও তাজুলের ‘কালো টাকার পাহাড়ের’ কাছে কি এই তদন্তও নতি স্বীকার করবে? নাকি ড. মুহম্মদ শারফুদ্দীনের নেতৃত্বাধীন এই কমিটি সমস্ত প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রকৃত সত্য উন্মোচন করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ উদ্ধারে সাহসী ভূমিকা রাখবে? পুরো গণপূর্ত অধিদপ্তর এখন তাকিয়ে আছে এই তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *