চকবাজারে আগুনে পুড়েছে ৬ষ্ঠ তলার গুদাম, আহত ফায়ার সার্ভিসের ৪ সদস্য

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজধানীর চকবাজারের মনসুর খান প্লাজায় লাগা আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে ভবনের ষষ্ঠ তলার গুদামগুলোতে থাকা মালামাল সরানো ও আগুন পুরোপুরি নির্বাপণের কাজ চলছে। অগ্নিকাণ্ডে ষষ্ঠ তলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সপ্তম তলায় ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলক কম। এ ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের চার সদস্য আহত হয়েছেন।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে এক ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামান।

তিনি জানান, সোমবার বিকেল ৫টা ৪ মিনিটে মনসুর খান প্লাজায় আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। খবর পেয়ে লালবাগ, সদর দপ্তরের সিদ্দিকবাজার ও পলাশী থেকে ছয়টি ইউনিট ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হয়। সেখানে পৌঁছে ষষ্ঠ ও সপ্তম তলায় প্রচণ্ড ধোঁয়া ও তাপ দেখতে পান ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।

তালাবদ্ধ গুদামে আগুন নেভাতে বেগ পেতে হয়

কাজী নজমুজ্জামান বলেন, ভবনের ষষ্ঠ তলার গুদামগুলোতে শাটার ও একাধিক তালা লাগানো ছিল। কোনো কোনো গুদামে চার থেকে পাঁচটি তালা ছিল। ভেতরের ক্রসফায়ার গেটেও তালা থাকায় আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের বাধার মুখে পড়তে হয়। প্রচণ্ড ধোঁয়া ও তাপের মধ্যে তালা কেটে গুদামে প্রবেশ করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে হয়েছে।

তিনি জানান, মঙ্গলবার ভোর ৫টা ২০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। তবে গুদামগুলোতে বিপুল পরিমাণ মালামাল থাকায় সেগুলো সরিয়ে পানি দিয়ে আগুন পুরোপুরি নির্বাপণের কাজ চলছে। মালামালের নিচে জমে থাকা তাপ থেকে আবার আগুন জ্বলে ওঠার আশঙ্কা থাকায় ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা এখনো ঘটনাস্থলে রয়েছেন।

আগুন নিয়ন্ত্রণে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ

ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা বলেন, অগ্নিনির্বাপণের সময় প্রধান তিনটি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। প্রথমত, চকবাজারের সরু রাস্তা ও তীব্র যানজটের কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সময় লাগে। দ্বিতীয়ত, ভবনের ষষ্ঠ ও সপ্তম তলায় ধোঁয়া বের হওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় প্রচণ্ড তাপ ও ধোঁয়ার মধ্যে কাজ করতে হয়েছে। তৃতীয়ত, আশপাশের পানির রিজার্ভ শেষ হয়ে আসায় বিকল্প রিজার্ভার থেকে পানি এনে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হয়েছে।

তিনি জানান, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জনবল কাজ করেছেন। প্রচণ্ড তাপ ও ধোঁয়ার কারণে একজন সদস্যকে ১৫ থেকে ২০ মিনিট কাজ করার পর সরিয়ে অন্য সদস্যকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ সময় মার্কেটের স্বেচ্ছাসেবক, স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থার সদস্যরা সহযোগিতা করেন। ওয়াসা কর্তৃপক্ষও পানি সরবরাহ করেছে।

সাত থেকে আটটি গুদামে আগুন

কাজী নজমুজ্জামান জানান, মনসুর খান প্লাজার ষষ্ঠ তলায় ১২ থেকে ১৪টি বড় গুদাম রয়েছে। এর মধ্যে সাত থেকে আটটি গুদামে আগুন লাগে। এসব গুদামে ছাতা, প্রসাধনসামগ্রী, আতরের বোতল ও আতরসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য মজুত ছিল। গুদামগুলো মালামালে পূর্ণ থাকায় সেগুলো সরিয়ে আগুন পুরোপুরি নির্বাপণে সময় লাগছে।

ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, কত টাকার মালামাল নষ্ট হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট মালিকপক্ষ হিসাব করে জানাতে পারবে।

আগুনের কারণ জানতে হবে তদন্তে

অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে কাজী নজমুজ্জামান বলেন, আগুন নির্বাপণের কাজ চলমান থাকায় এখনই নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে, তবে তদন্তের আগে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, মনসুর খান প্লাজার সঙ্গে আশপাশের তিন থেকে চারটি মার্কেট যুক্ত রয়েছে। আগুন পাশের ভবন ও দোকানে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকলেও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের প্রচেষ্টায় বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। পুরো মার্কেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি; মূলত ষষ্ঠ তলা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সপ্তম তলায় সামান্য ক্ষতি হয়েছে।

চকবাজারে অগ্নিনিরাপত্তা জোরদারের পরামর্শ

ঘনবসতিপূর্ণ ও ব্যস্ত ব্যবসাকেন্দ্র চকবাজারে অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে কাজী নজমুজ্জামান রাস্তা প্রশস্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি ঢাকা সিটি করপোরেশন ও ওয়াসার মাধ্যমে সড়কে হাইড্র্যান্ট ব্যবস্থা চালুর পরামর্শ দেন তিনি।

তাঁর মতে, নির্দিষ্ট স্থানে হাইড্র্যান্ট স্থাপন করা গেলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত পাইপ সংযোগ দিয়ে পানি সংগ্রহ করতে পারবেন। এতে অগ্নিকাণ্ডের সময় পানি সরবরাহের সংকট মোকাবিলা সহজ হবে।

আগুন নেভাতে পানি ব্যবহারের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, এটি কঠিন বা সলিড পদার্থে লাগা আগুন। এ ধরনের আগুন নেভাতে পানি উপযোগী। পেট্রোল বা অন্য জ্বালানিতে আগুন লাগলে পরিস্থিতি অনুযায়ী ফোম ব্যবহার করা হয়।

অগ্নিকাণ্ডে ফায়ার সার্ভিসের চার সদস্য আহত হয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, নির্ধারিত কৌশল অনুসরণ করে সদস্যদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই আগুন পুরোপুরি নির্বাপণের কাজ চালানো হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *