কামরুল ইসলাম:
চট্টগ্রাম মহানগরীর সড়কগুলোতে দিন দিন বেড়েই চলেছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার দাপট। নগরের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি—প্রায় সর্বত্রই অবাধে চলাচল করছে এসব যানবাহন। অভিযোগ রয়েছে, অনেক গাড়ির অনুমোদন, নিবন্ধন, রুট পারমিট কিংবা চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ নেই। ফলে একদিকে বাড়ছে যানজট, অন্যদিকে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। কেউ হারাচ্ছেন প্রাণ, কেউ আবার সারাজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করছেন। মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল নিষিদ্ধ হলেও নগরীর বিভিন্ন সড়কে এসব যানবাহনের চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং অভিযান ও জব্দের পর কিছুদিন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও পরে আবারও রাস্তায় ফিরে আসছে এসব যান। ফলে নগরবাসীর মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ ও আতঙ্ক।
শুধু সড়কে চলাচলকারী যানবাহন নয়, নগরের বিভিন্ন এলাকায় এসব অটোরিকশা বিক্রি ও চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু সড়কে অভিযান পরিচালনা করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। উৎপাদন, আমদানি, বিক্রি, চার্জিং ও চালকদের প্রশিক্ষণ—সবকিছুর ওপর সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা না করা গেলে দুর্ঘটনা কমানো কঠিন হবে।
মা-ভক্ত তরুণ সাকিবের বাড়ি বাঁশখালী উপজেলায় হলেও পড়াশোনার কারণে থাকতেন চট্টগ্রাম শহরে। পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি করতেন। পরিবারের কিছুটা স্বচ্ছলতার জন্য টিউশনিও করতেন তিনি। মাকে একটু সুখে রাখার স্বপ্নে চলছিল তাঁর বিরামহীন জীবনসংগ্রাম। কিন্তু সেই সংগ্রামের পথেই নেমে আসে মর্মান্তিক পরিণতি। বাকলিয়া থেকে টিউশনি শেষে ফেরার পথে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ধাক্কায় গুরুতর আহত হন সাকিব। পরে হাসপাতালে চার দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে গত ২৬ জুলাই না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি।
সাকিবের পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। একটি দুর্ঘটনা থামিয়ে দেয় একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি তরুণের ভবিষ্যৎ এবং মাকে সুখে রাখার আকাঙ্ক্ষা। সাকিবের মতো আরও অনেকের জীবনেই এখন সড়কে আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও সিএনজি। এসব যানবাহনের ধাক্কায় কেউ প্রাণ হারাচ্ছেন, আবার কেউ গুরুতর আহত হয়ে সারাজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করছেন।
এই আতঙ্ক থেকে রেহাই পায়নি তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী নাওয়াল আনসারীও। গত সোমবার সকালে পুলিশ কর্মকর্তা বাবা আনসারুল করিম মেয়েকে বিদ্যালয়ে দিয়ে যান। কিন্তু দুপুরে নিজের বাসার সামনেই মেয়েকে অটোরিকশার ধাক্কায় রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে হয় বাবাকে। দ্রুতগতির অটোরিকশা ও সিএনজির ধাক্কায় গুরুতর আহত হয় ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের এই ছাত্রী। দুর্ঘটনায় নাওয়ালের দুই হাত, মাথা, ঠোঁটসহ পুরো মুখমণ্ডলে গুরুতর জখম হয়। পরে তাকে দুটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। মেয়ের এমন পরিণতিতে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক পোস্ট দেন আনসারুল করিম। নিজের বাসার নিচেও সন্তান নিরাপদ না থাকলে নগরবাসী কোথায় নিরাপদ—এমন প্রশ্ন তুলে তিনি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
চট্টগ্রাম মহানগরীর সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও সিএনজি চলাচল নিষিদ্ধ করে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। এরপর বিভিন্ন সময়ে এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হয়। গত বছরের ১৮ এপ্রিল কাপাসগোলা এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা উল্টে হিজরা খালে পড়ে ছয় মাস বয়সী সেহেরীশ নিহত হওয়ার পর এসব রিকশার বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করা হয়। অভিযানের সময় নগরের বিভিন্ন সড়ক ও গ্যারেজ থেকে তিন হাজারের বেশি অটোরিকশা ও সিএনজি জব্দ করা হয় বলে জানা গেছে। পাশাপাশি ব্যাটারি চার্জিং পয়েন্টের বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, অভিযান শেষ হওয়ার কয়েক দিন পরই জব্দ করা অনেক রিকশা ও সিএনজি আবার ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর চালকেরা সেগুলো নিয়ে পুনরায় সড়কে নামেন। ফলে অভিযান পরিচালনা করেও স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না এসব যানবাহন।
চট্টগ্রাম শহরে ঠিক কতটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও সিএনজি চলাচল করছে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব নেই। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, নগরের সড়কে অবৈধভাবে দেড় লাখের বেশি অটোরিকশা চলাচল করছে। এসব যানবাহনের অনেকগুলোরই অনুমোদন, নিবন্ধন ও রুট পারমিট নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি অপ্রশিক্ষিত চালকদের হাতেও তুলে দেওয়া হচ্ছে দ্রুতগতির এসব যান। অনেক চালক পুলিশি অভিযানের ভয়ে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালান বলেও অভিযোগ রয়েছে। কখনো রং সাইডে ঢুকে পড়া, কখনো অতিরিক্ত গতিতে চলাচল, আবার কখনো হঠাৎ করে রাস্তার মাঝখানে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানোর কারণে তৈরি হচ্ছে ঝুঁকি। চালকদের অনেকেরই নিরাপদ গতিসীমা কিংবা ট্রাফিক আইন সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে নিজেদের পাশাপাশি পথচারী ও অন্যান্য যানবাহনের যাত্রীদের জীবনও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
নগরের বিভিন্ন সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও সিএনজির এমন দাপটে অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েছেন পথচারীরা। কোথাও ফুটপাতের ওপর দিয়ে, কোথাও রং সাইডে, আবার কোথাও ব্যস্ত সড়কের মাঝ দিয়ে এসব যান চলাচল করতে দেখা যায়। নগরবাসীর অভিযোগ, দিনের বিভিন্ন সময়ে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করলেও অনেক ক্ষেত্রে এসব যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল ঠেকানো যাচ্ছে না। ফলে নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও কীভাবে বিপুলসংখ্যক যান সড়কে চলাচল করছে—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু চালককে আটক বা গাড়ি জব্দ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এসব যানবাহনের উৎপাদন, আমদানি, বিক্রি, নিবন্ধন, চার্জিং ব্যবস্থা এবং সড়কে চলাচল—সব পর্যায়েই কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।
সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভুঁইয়া বলেন, মহানগরীর গণপরিবহনের ক্ষেত্রে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এক ধরনের মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গেলে দেখা যাবে, আহতদের ১০ থেকে ৩০ শতাংশই অটোরিকশাজনিত দুর্ঘটনার শিকার। এসব গাড়ির বিষয়ে সরকার একটি সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছে। আপাতত সেই সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ। তিনি আরও বলেন, পাশাপাশি নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন বিশিষ্ট নগরপরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদারও। গত ৯ মে বাসার সামনে সড়ক পার হওয়ার সময় অটোরিকশার ধাক্কায় গুরুতর আহত হন তিনি। পরে প্রায় দুই মাস বিছানাবন্দি থাকতে হয় তাকে। চিকিৎসায় খরচ হয়েছে ১ লাখ ৮২ হাজার টাকা। দৈনিক স্বাধীন সংবাদ ও দৈনিক বাংলাদেশ পত্রিকার চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় প্রধান কামরুল ইসলামকে প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, এই অটোরিকশা ও সিএনজি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ পঙ্গু মানুষের দেশে পরিণত হবে। তিনি বলেন, গত এক বছরে শুধু লালখান বাজার এলাকায় তিনি এক ডজন অটোরিকশা দুর্ঘটনা চাক্ষুষ করেছেন। তাঁর মতে, এসব গাড়ি কোনোভাবেই সড়কের জন্য ভারসাম্যপূর্ণ নয়। দেলোয়ার মজুমদার আরও বলেন, অপ্রশিক্ষিত ও নিবন্ধনবিহীন চালকেরা এসব গাড়ি চালাচ্ছেন, যাদের ওপর রাষ্ট্রীয় কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে এসব যান সড়কে মানুষের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নগরের সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও সিএনজির অবাধ চলাচল বন্ধ করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু সড়কে অভিযান চালিয়ে গাড়ি জব্দ করলে কিছুদিন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে। কিন্তু জব্দ করা গাড়ি যদি পরে আবার ছেড়ে দেওয়া হয় এবং সেগুলো পুনরায় সড়কে নামে, তাহলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। তাই অবৈধ যানবাহনের উৎপাদন ও আমদানি নিয়ন্ত্রণ, বিক্রয়কেন্দ্রে নজরদারি, চার্জিং পয়েন্ট নিয়ন্ত্রণ, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স নিশ্চিত করা এবং সড়কে কঠোর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে দুর্ঘটনা ঘটলে দায় নির্ধারণ এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
সাকিবের মৃত্যু, নাওয়ালের আহত হওয়া কিংবা প্রতিদিনের অসংখ্য ছোট-বড় দুর্ঘটনা—সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম নগরীর সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। একটি দুর্ঘটনা শুধু একজন মানুষের জীবন কেড়ে নেয় না; একটি পরিবারকে দীর্ঘদিনের জন্য বিপর্যস্ত করে দেয়। আহতদের অনেকেই কর্মক্ষমতা হারান, পরিবারের ওপর চিকিৎসার ব্যয়ভার চাপিয়ে দেন এবং কেউ কেউ সারাজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করেন। নগরবাসীর প্রশ্ন—আর কত প্রাণ ঝরলে, আর কত মানুষ আহত বা পঙ্গু হলে এই ‘মরণফাঁদ’ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে? নিষেধাজ্ঞা, অভিযান ও জব্দের পরও যদি একই যানবাহন বারবার সড়কে ফিরে আসে, তাহলে শুধু চালককে দায়ী করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ। নগরবাসীর প্রত্যাশা, মানুষের জীবনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও সিএনজির অনিয়ন্ত্রিত চলাচল বন্ধে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সড়ক হবে এমন একটি নিরাপদ জায়গা, যেখানে সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে অভিভাবককে সারাক্ষণ দুর্ঘটনার আশঙ্কায় থাকতে হবে না, আর টিউশনি বা কাজ শেষে কোনো তরুণকে বাড়ি ফেরার পথে জীবন হারাতে হবে না।