মোঃআনজার শাহ:-
রাজনীতির মাঠে এবার গর্জে উঠলেন বরুড়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি কায়সার আলম সেলিম। ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীদের সরাসরি চোখে চোখ রেখে তিনি বললেন, “চাঁদাবাজি করে কিংবা মাদক বিক্রেতার কাছ থেকে টাকা এনে যদি কেউ ভাবেন সংসার চালাবেন, তাহলে এখনই সাবধান হয়ে যান। বিএনপিতে আপনার জন্য এক ইঞ্চি জায়গাও থাকবে না।”
শুধু হুঁশিয়ারিতেই থামেননি তিনি। আওয়ামী লীগের সঙ্গে গোপন আঁতাতকারীদেরও “দলের শত্রু ও ব্যক্তিগত শত্রু” ঘোষণা করে কঠোর বার্তা দিলেন এই বিএনপি নেতা। একই সঙ্গে বরুড়াকে ঢেলে সাজাতে ঘোষণা করলেন মেগা লিংক রোড পরিকল্পনাসহ একগুচ্ছ উন্নয়ন কার্যক্রমের।
আড্ডা ইউনিয়নে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের এক গুরুত্বপূর্ণ সমাবেশে দেওয়া এই বক্তব্য ইতিমধ্যে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
✦ “পেশা নয়, আদর্শই বিএনপির ভিত্তি”
কায়সার আলম সেলিম বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল কারো জীবিকা অর্জনের হাতিয়ার নয়। যাঁরা যে পেশায় আছেন, তাঁরা সেই পেশায় সৎভাবে কাজ করবেন। কর্মক্ষেত্রে কোনো বাধার সম্মুখীন হলে দল পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু চাঁদাবাজি বা মাদকের কালো টাকায় ঘর চালানোর চেষ্টা করলে দলে তাঁদের জন্য কোনো ক্ষমা নেই।
তিনি রুদ্রকণ্ঠে বলেন, “ছাত্রদলের ভাই, যুবদলের ভাই, স্বেচ্ছাসেবক দলের ভাই — যদি মনে করো চাঁদাবাজি করে সংসার চালাবে অথবা মাদক বিক্রেতার কাছ থেকে টাকা নিয়ে সংসার চালাবে, তাহলে এখনই সাবধান হয়ে যাও। এটি শুধু আমার কথা নয় — এটি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমনের সরাসরি নির্দেশনা। বিএনপিতে তোমাদের কোনো জায়গা থাকবে না।”
✦ “আওয়ামী দোসরদের সাথে আঁতাত করলে তুমি আমার শত্রু”
বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে দলের সবচেয়ে বড় ক্ষত হিসেবে চিহ্নিত করে কায়সার আলম সেলিম এই দুর্বলতার পেছনে তিনটি মূল কারণ তুলে ধরেন,
– স্থানীয় সরকার নির্বাচনকেন্দ্রিক গোষ্ঠীস্বার্থ ও কোন্দল
– ব্যক্তিগত শত্রুতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাস
– আওয়ামী লীগের সঙ্গে গোপন সম্পর্ক ও আঁতাত
তিনি গলা উঁচিয়ে বলেন, “যে আওয়ামী লীগ আমাদের দলের ভাইদের রক্ত ঝরিয়েছে, মিথ্যা মামলায় জেলে পুরেছে, শারীরিকভাবে নির্যাতন করেছে, সেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে যদি তুমি হাত মেলাও, তাহলে তুমি দলের শত্রু, তুমি আমার শত্রু। এ বিষয়ে আগেও বলেছি, আজও বলছি, আর কোনো ছাড় নেই।”
✦ মন্ত্রীর অঙ্গীকার: চাঁদাবাজমুক্ত ও মাদকমুক্ত বরুড়া:
কায়সার আলম সেলিম মনে করিয়ে দেন, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন নির্বাচনী ইশতেহারে বরুড়াবাসীর কাছে দুটি সুনির্দিষ্ট ওয়াদা করেছেন :-
*এক. চাঁদাবাজমুক্ত বরুড়া গড়ে তোলা।*
*দুই. মাদকমুক্ত বরুড়া প্রতিষ্ঠা করা।*
তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, “এই ওয়াদা পূরণ করতে হলে আপনাদের সক্রিয় সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই। জনগণকে সঙ্গে না নিয়ে একা সরকার বা দল এটা কোনোদিন সম্ভব করতে পারবে না।”
এরপর তিনি তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন ছুড়ে দেন, “জাকারিয়া তাহের সুমন আজ সমগ্র বাংলাদেশের মন্ত্রী। তাঁর মাধ্যমে গোটা বাংলাদেশ বরুড়াকে চিনবে। তবে সেটা গর্বের পরিচয়ে চিনবে, নাকি লজ্জার পরিচয়ে — সেই দায়িত্ব আপনাদের কাঁধেই।”
✦ বরুড়ার যানজট নিরসনে ঐতিহাসিক লিংক রোড পরিকল্পনা:
বরুড়া বাজারের দীর্ঘদিনের যানজটকে উপজেলার এক নম্বর সমস্যা উল্লেখ করে কায়সার আলম সেলিম জানান, মন্ত্রীর নির্দেশে মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষজ্ঞ নগর পরিকল্পনাবিদ পাঠানো হয়েছে। স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, জেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন দপ্তরের প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে চূড়ান্ত করা হয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ *লিংক রোড নেটওয়ার্ক পরিকল্পনা।* এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত সড়কগুলো হলো :
▶ সড়ক ১ — গোডাউন দক্ষিণ → বাকশার রোড → তলাগ্রাম উত্তর
বর্তমানে মাত্র ৮ থেকে ১০ ফিট প্রশস্ত এই সড়কটি ১৮ ফিটে উন্নীত করা হবে। এর ফলে দক্ষিণ বরুড়ার মানুষ কুমিল্লা শহর থেকে এসে সরাসরি তলাগ্রাম রোড ধরে বাজার অতিক্রম না করেই আড্ডায় পৌঁছাতে পারবেন।
▶ সড়ক ২ — তলাগ্রাম → আলী আজমের বাড়ির সামনে → বরুড়া জলম রোড
বরুড়া পৌরসভার সন্নিকটে মিলিত হওয়া এই সংযোগ সড়কটিও হবে ১৮ ফিট প্রশস্ত।
▶ সড়ক ৩ — বরুড়া পৌরসভার সামনে → সুসুন্ডা → পুরান কাতলা → নিমসার
উত্তর বরুড়ার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপনকারী এই ১৮ ফিট সড়কটি পুরান কাতলা থেকে গোডাউন পর্যন্ত একটি সম্পূর্ণ চক্রাকার লিংক রোড তৈরি করবে।
▶ সড়ক ৪ — পেরুয়া → চিতচ্চার (সম্পূর্ণ নতুন সড়ক)
প্রশাসন ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত করা এই সড়কটিও হবে ১৮ ফিট প্রশস্ত।
এই লিংক রোড বাস্তবায়িত হলে যে সুবিধা মিলবে :
দক্ষিণ বরুড়ার মানুষ,বাজার অতিক্রম না করেই তলাগ্রাম হয়ে সরাসরি আড্ডায় আসতে এবং দক্ষিণে ফিরে যেতে পারবেন।
পশ্চিম বরুড়ার মানুষ,বাজার না পেরিয়ে পুরান কাতলা-জলম রোড হয়ে উত্তর বরুড়ায় সহজে যাতায়াত করতে পারবেন।
উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে এবং দীর্ঘদিনের যানজট ভোগান্তির অবসান ঘটবে।
কায়সার আলম সেলিম জানান, মন্ত্রী মহোদয় এই লিংক রোড বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন। যে সড়কে জনচলাচল সবচেয়ে বেশি, সেটি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে।
বরুড়া সরকারি কলেজের বেহাল দশা নিরসনে কঠোর পদক্ষেপ:
কায়সার আলম সেলিম জানান, বরুড়া সরকারি কলেজের দক্ষিণ পাশের ভবনটি সম্পূর্ণ জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব পাশের পুকুরপাড় চরম অবহেলায় পড়ে থেকে কার্যত মাদকসেবীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। এই লজ্জাজনক পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইতিমধ্যে কলেজের জন্য আলাদা ডিও লেটার প্রদান করেছেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, জরাজীর্ণ ভবন ভেঙে দুটি পুকুর একত্রিত করে ওয়ান-ওয়ে ব্যবস্থা তৈরি করে সেখানে একটি নতুন আধুনিক ভবন নির্মাণ করা হবে। উল্লেখ্য, এই ভবনটি ২০২৩ সালেই হস্তান্তর হওয়ার কথা ছিল কিন্তু তৎকালীন সরকারের অবহেলায় তা বাস্তবায়িত হয়নি। মন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশে কায়সার আলম সেলিম ইতিমধ্যে কলেজের অধ্যক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস নিয়েছেন।
ব্রিজ পরিকল্পনাও আসছে শিগগিরই,
কায়সার আলম সেলিম জানান, সড়ক পরিকল্পনার পাশাপাশি বরুড়ার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একাধিক ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনাও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ইনশাআল্লাহ, শিগগিরই এই পরিকল্পনার পূর্ণ বিবরণ জনসমক্ষে তুলে ধরা হবে।
সংক্ষেপে মূল বার্তা:
চাঁদাবাজি ও মাদকের বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতা, আওয়ামী দোসরদের প্রতি কঠোর অবস্থান এবং বরুড়ার উন্নয়নে মেগা পরিকল্পনা এই তিন বার্তা নিয়ে বরুড়ার রাজনীতির মাঠে নতুন বার্তা দিলেন কায়সার আলম সেলিম।