জেলেদের চালে কমতি, তালিকায় অজেলে! ঝালকাঠিতে ভিজিএফ বিতরণে নানা অনিয়মের অভিযোগ

আমির হোসেন:

ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলায় সমুদ্রগামী জেলেদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি ভিজিএফ চাল বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত জেলেদের প্রাপ্য চাল কম দেওয়া হয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে জেলে নন—এমন দোকানদার, ব্যবসায়ী, বালুবাহী জাহাজের শ্রমিক ও চাকরিজীবীদেরও “জেলে” পরিচয়ে চাল দেওয়া হয়েছে। এতে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন প্রকৃত সমুদ্রগামী জেলেরা।

সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সমুদ্রে ৫৮ দিন মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞার সময় ক্ষতিগ্রস্ত জেলে পরিবারের জন্য মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ভিজিএফ চাল বরাদ্দ দেয়। কর্মসূচি অনুযায়ী, প্রত্যেক সমুদ্রগামী জেলে পরিবারকে ৫৮ দিনের জন্য মাসিক ৪০ কেজি হারে মোট ৭৭ কেজি ৩০০ গ্রাম চাল দেওয়ার কথা।

উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া ইউনিয়নে ২২ জন, গালুয়া ইউনিয়নে ১২০ জন এবং বড়ইয়া ইউনিয়নে ৯৮ জনসহ মোট ২৪০ জন সমুদ্রগামী জেলের নামে সরকার ১৮ দশমিক ৫৫৯ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, তিনটি ইউনিয়ন পরিষদেই চাল বিতরণে নানা অনিয়ম করা হয়েছে। জেলেদের দেওয়া স্লিপে ৭৭ কেজি ৩০০ গ্রাম চাল উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে দেওয়া হয়েছে মাত্র ৭৫ কেজি করে। অর্থাৎ, প্রতি জেলের কাছ থেকে ২ কেজি ৩০০ গ্রাম চাল কম দেওয়া হয়েছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, চাল বিতরণের সময় উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা গৌতম মণ্ডল উপস্থিত থাকলেও এ অনিয়মের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি। তিনি বিষয়টি দেখেও নীরব ছিলেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে গালুয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে। তিনি স্থানীয় বিএনপির নেতাদের যোগসাজশে প্রকৃত সমুদ্রগামী জেলে নন—এমন ব্যক্তিদেরও তালিকাভুক্ত করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, নিবন্ধিত সমুদ্রগামী জেলেদের সরকারি কার্ডে ট্রলিং নম্বর থাকার কথা। কিন্তু গালুয়া ইউনিয়নের ১২০ জনের তালিকায় মাত্র ৮১ জনের নামে ট্রলিং নম্বর পাওয়া গেছে। বাকি ৩৯ জনের নামের পাশে কোনো ট্রলিং নম্বর নেই। অভিযোগকারীদের দাবি, এরা কেউই প্রকৃত জেলে নন।

ভুক্তভোগী মো. মিরাজ, মো. সোহেল আকন, আনোয়ার তালুকদার, নাসির উদ্দীন হাওলাদারসহ কয়েকজন জেলে অভিযোগ করে বলেন, “সরকার আমাদের ৭৭ কেজি ৩০০ গ্রাম চাল দিয়েছে। কিন্তু আমরা পেয়েছি ৭৫ কেজি করে। প্রতিবাদ করলেও কোনো লাভ হয়নি।”

অন্যদিকে জেলে কামাল, দুলাল, এনায়েত বলেন, “আমাদের মতো প্রকৃত জেলেরা অনেকেই চাল পায় না। অথচ দোকানদার, ব্যবসায়ী ও অন্য পেশার লোকজন চেয়ারম্যানের মাধ্যমে চাল পেয়েছে।”

তারা আরও অভিযোগ করে বলেন, চেয়ারম্যানের তালিকায় আলাউদ্দিন, রশিদ ফরাজি, তহীদ খা, মাইদুল ইসলাম, নাসির নিকারী, হারুন নিকারী, ফরহাদ নিকারী, রফিক বেপারী ও ইউনুস—এরা কেউ সমুদ্রগামী জেলে নন। তারপরও তাদের চাল দেওয়া হয়েছে।

তবে চাল কম দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন গালুয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, “সবাইকে ৭৫ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে। বাকি ২ কেজি ৩০০ গ্রাম করে জমা হওয়া চাল তালিকার বাইরে আরও দুজন জেলেকে দেওয়া হয়েছে।”

তবে অজেলে ব্যক্তিদের চাল দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি দাবি করেন, “সব কার্ডধারী জেলেদের মাঝেই চাল বিতরণ করা হয়েছে।”

অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা গৌতম মণ্ডল বলেন, “২০১২-১৩ সালে সরকার ট্রলিং জেলেদের জন্য বিশেষ কার্ড চালু করে। সরকারি তালিকায় যাদের নাম রয়েছে, তারাই চাল পাওয়ার যোগ্য। সবাইকে সঠিকভাবে চাল দেওয়া হয়েছে। কেউ প্রকৃত জেলে না হয়েও চাল নিয়ে থাকলে অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিফাত আরা মৌরি বলেন, “চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে এলাকার মানুষকে চেনেন। তারা যে তালিকা পাঠান, আমরা সেটির অনুমোদন দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদে চাল পাঠাই। তবে তালিকার বাইরে কাউকে চাল দেওয়ার অনুমতি নেই। জেলেদের চাল কম দেওয়া হয়েছে বা অজেলে ব্যক্তিরা চাল পেয়েছেন—এমন কোনো লিখিত অভিযোগ এখনো পাইনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

স্থানীয়দের দাবি, জেলেদের জন্য বরাদ্দকৃত খাদ্য সহায়তা নিয়ে অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে প্রকৃত জেলেরা ভবিষ্যতে আরও বঞ্চিত হবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *