ট্রাম্পের নির্বাচনী পরাজয়ে ইরানে উল্লাস ও কটাক্ষ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির পরাজয়ের পর ইরানের রাজধানী তেহরানে উল্লাস প্রকাশ করেছেন হাজারো মানুষ। বুধবার (৪ নভেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক দূতাবাসের সামনে আয়োজিত বার্ষিক আমেরিকাবিরোধী সমাবেশে অংশ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক বিপর্যয় নিয়ে কটাক্ষ করেন তাঁরা।

তেহরানের কেন্দ্রস্থলে অনুষ্ঠিত সমাবেশে ‘আমেরিকা নিপাত যাক’ ও ‘ইসরায়েল নিপাত যাক’ স্লোগান দেন বিক্ষোভকারীরা। তাঁদের হাতে ছিল ইরানের জাতীয় পতাকা। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নানা বক্তব্যসংবলিত ব্যানার ও ফেস্টুন প্রদর্শন করা হয়।

সমাবেশে একটি বড় ব্যানারে ট্রাম্পকে শিকলে বাঁধা রক্তমাখা বুলডগ হিসেবে চিত্রিত করা হয়। ব্যানারে শিকলের অপর প্রান্তে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর আদলে শয়তানের মতো একটি অবয়ব দেখানো হয়। অন্য ব্যানারে ইরানের নিহত সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

সমাবেশস্থলে প্রদর্শিত আরেকটি বিশাল ব্যানারে লেখা ছিল, ‘মূল্য কত হবে, তা নির্ধারণ করেছে ইরানের জনগণ।’ এর পাশে বিশ্বের মানচিত্রের ওপর সারি সারি কালো তেলের ড্রাম সাজানো হয়। এর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরা হয়।

১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল ও ৫২ জন মার্কিন নাগরিককে জিম্মি করার ঘটনাকে স্মরণ করে প্রতিবছর এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশে অংশ নেওয়া ৪০ বছর বয়সী মাহমুদখানি বলেন, ‘আমেরিকা বহু বছর ধরে আমাদের ওপর অত্যাচার চালিয়ে আসছে। কিন্তু ইরানের কোনো ক্ষতি তারা করতে পারেনি।’

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শুল্কনীতির পরিবর্তন এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন জনগণের অসন্তোষকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচনের ফলকে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের সরকারের প্রতি একধরনের জনমত যাচাই হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছিল।

মাহমুদখানি বলেন, ‘তেলের দাম এত বেড়ে যাওয়া নিয়ে আমরা খুশি নই। তবে এখন অন্তত মনে হচ্ছে, এই কষ্ট শুধু আমাদের একার নয়। বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের মানুষকে একাই দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।’

তেহরানের ৬২ বছর বয়সী কাপড় প্রস্তুতকারক মজিদ হেইদারির মতে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি মার্কিন ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। তিনি বলেন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র যখন একজোট হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তখন ইরানকেও নিজেদের হাতে থাকা কৌশল ব্যবহার করতে হয়। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে সরকারগুলোর ওপর চাপ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে ইরানের সাধারণ মানুষের জীবনে বাস্তব কোনো পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন হেইদারি।

৪২ বছর বয়সী সরকারি কর্মকর্তা মোহাম্মদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাট কিংবা রিপাবলিকান—যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, ইরানের প্রতি দেশটির নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন হয় না। তাঁর মতে, গত ৫০ বছর ধরে ইরানের জনগণের প্রতি মার্কিন সরকারের মনোভাব একই রয়েছে।

যুদ্ধবিরোধী জনমতের কথা বলল তেহরান

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল নিয়ে তেহরানের প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় প্রধান মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ মার্কিন জনগণের রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, বিবেকের তাড়নায় হোক কিংবা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে—আমেরিকান জনগণ স্পষ্টভাবে যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ইরান তাদের এই বার্তাকে পূর্ণ সমর্থন জানায়।

তবে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলমান কূটনৈতিক আলোচনা এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। নতুন করে সংঘাত শুরুর আশঙ্কাও রয়েছে।

১৯৭৯ সালের নভেম্বরে মার্কিন সমর্থিত শাসক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে ক্ষমতাচ্যুত করার কয়েক মাস পর তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে হামলা চালানো হয়। দূতাবাস ঘেরাও করা ছাত্ররা যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন শাহকে ইরানে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানান। এ সময় ৫২ জন মার্কিন নাগরিককে ৪৪৪ দিন জিম্মি করে রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৮০ সালে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়।

এরপর থেকে প্রতিবছর এই দিনটি পশ্চিমা আধিপত্য ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে পালন করে আসছে ইরান। বুধবারের সমাবেশে প্রদর্শিত একটি রক্তমাখা রাজমুকুটের ব্যানারে লেখা ছিল, ‘ফাঁকা মাথার ওপর অহংকারের মুকুট।’

তেহরানের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩৫ বছর বয়সী প্রধান শিক্ষিকা বাঘেরি বলেন, ‘আমেরিকা যেকোনো অবস্থাতেই আমাদের চরম শত্রু। হোয়াইট হাউসে কে ক্ষমতায় বসলো, তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *