কামরুল ইসলাম:
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চট্টগ্রাম সফরকে কেন্দ্র করে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগর প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলো। একদিনের সফরে রোববার কক্সবাজারের মহেশখালী ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারীর বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির প্রভাবশালী সদস্য ও লোহাগাড়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক সালাউদ্দিন চৌধুরী (সোহেল) বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো চট্টগ্রামে আসছেন বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমান। তাঁর আগমনকে ঘিরে চট্টগ্রামের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফর সফল করতে দলীয় ও প্রশাসনিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
সফরসূচি অনুযায়ী, রোববার সকাল ৯টার দিকে মহেশখালীতে পৌঁছাবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প ও মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (মিডা) কার্যক্রম পরিদর্শন করবেন তিনি। পরে হেলিকপ্টারে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন এলাকায় যাবেন। সেখানে সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ত্রাণ বিতরণ করবেন। একই অনুষ্ঠানে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ও গৃহহারা ১০০ পরিবারের হাতে নতুন ঘরের চাবি তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে।
বাঁশখালীতে ব্যাপক প্রস্তুতি
প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে বাঁশখালীতে বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার উপজেলার চেচুরিয়া এস কে বি কনভেনশন হলে এ উপলক্ষে প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দিন। সভাপতিত্ব করেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা।
সভায় উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে দলীয় প্রস্তুতি জোরদারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নেতাকর্মীদের সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণভাবে প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচি সফল করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়।
লায়ন হেলাল উদ্দিন বলেন, দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর পর প্রধানমন্ত্রীর বাঁশখালী আগমন স্থানীয় মানুষের জন্য আবেগ ও গৌরবের বিষয়। অন্যদিকে মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর বাঁশখালীর জন্য একটি ঐতিহাসিক আয়োজন। কর্মসূচি সফল করতে নেতাকর্মীদের ঐক্য, শৃঙ্খলা ও সাংগঠনিক সক্ষমতার পরিচয় দিতে হবে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানস্থলে মঞ্চ ও প্যান্ডেল নির্মাণসহ শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা অনুষ্ঠানস্থল, হেলিপ্যাড, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও নির্মাণাধীন ঘরগুলো পরিদর্শন করেছেন।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক বন্যায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার মধ্যে বাঁশখালী অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা। বিশেষ করে জেলে সম্প্রদায় ও মাটির ঘরে বসবাসকারী বহু পরিবারের ঘর সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এবং নতুন করে ঘর নির্মাণের সামর্থ্য নেই—এমন পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে ১০০টি পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী প্রথমে স্বামীহারা এক নারীর হাতে নতুন ঘরের চাবি তুলে দেবেন। সন্তানদের নিয়ে বসবাসকারী ওই নারীর হাতে চাবি হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে প্রতীকীভাবে ১০০টি পরিবারের মধ্যে নতুন ঘর হস্তান্তর কার্যক্রম শুরু হবে।
ফটিকছড়িতে হেফাজত নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ
বাঁশখালীর কর্মসূচি শেষে দুপুরের দিকে ফটিকছড়িতে যাওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। সেখানে নাজিরহাট পৌরসভার বাবুনগর এলাকার আল জামিয়াতুল ইসলামীয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় গিয়ে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন তিনি।
পরে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের প্রায় ৫০ জন জ্যেষ্ঠ নেতার সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় সভায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।
হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে এ সফরকে অরাজনৈতিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংগঠনটির আমিরের মুখপাত্র ও নাতি মাওলানা রহমতুল্লাহ জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর শপথের সময় আমিরের সঙ্গে দেখা করার যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, সেই প্রতিশ্রুতি রাখতেই ফটিকছড়ি সফর করছেন। সেখানে কোনো রাজনৈতিক সমাবেশ বা জনসভা হবে না; সৌজন্য সাক্ষাতের পর কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে বাবুনগর মাদ্রাসায় প্যান্ডেল ও মঞ্চ প্রস্তুত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ফটিকছড়ির পেলাগাজিতে অস্থায়ী হেলিপ্যাড নির্মাণের কাজও প্রায় শেষ হয়েছে।
হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির মাওলানা আইয়ুব বাবুনগরী জানান, সাক্ষাতের সময় ফটিকছড়িবাসীর সার্বিক কল্যাণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা হবে। এর মধ্যে ফটিকছড়িতে ৫০০ শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপন, চট্টগ্রাম শহর থেকে নাজিরহাট হয়ে রামগড় পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণ এবং চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার দাবি রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর আগমনস্থল বাবুনগর মাদ্রাসা ও পেলাগাজির অস্থায়ী হেলিপ্যাড পরিদর্শন করেছেন রাউজানের সংসদ সদস্য গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও ফটিকছড়ির সংসদ সদস্য সরোয়ার আলমগীর।
সরোয়ার আলমগীর বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ফটিকছড়ি সফর স্থানীয় মানুষের জন্য আনন্দ ও গর্বের বিষয়। স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষাক্ষেত্রে অগ্রগতি এবং দীর্ঘদিনের বিভিন্ন দাবির বিষয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা হবে।
গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী ফটিকছড়িতে আসছেন এবং আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন—এটি তাঁর জন্য বিশেষ আনন্দের বিষয়।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে ফটিকছড়ির স্থানীয় বাসিন্দা, বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যেও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। মাদ্রাসামুখী সড়কগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, ধোয়া-মোছা এবং বিভিন্ন স্থানে তোরণ নির্মাণের কাজ চলছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তাব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে।
হাটহাজারীতে শাহ আহমদ শফীর কবর জিয়ারত
ফটিকছড়ি থেকে সড়কপথে হাটহাজারীতে যাবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসায় গিয়ে হেফাজতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা আমির মরহুম আল্লামা শাহ আহমদ শফীর কবর জিয়ারত করার কথা রয়েছে তাঁর।
এরপর মাদ্রাসা সংলগ্ন চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের ডাকবাংলোয় কিছু সময় বিশ্রাম নেবেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁকে স্বাগত জানাতে ডাকবাংলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, রং-চুনকাম ও সড়ক সংস্কারের কাজ শেষ করা হয়েছে। প্রধান ফটকও সাজানো হয়েছে। পাশাপাশি হাটহাজারী-ফটিকছড়ি আঞ্চলিক সড়কের অবৈধ স্থাপনা সরানোর কাজ চলছে।
হাটহাজারী সরকারি কলেজ মাঠে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। সেখানে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের পক্ষ থেকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৩০টি পরিবারকে ঘর নির্মাণের সহায়তা হিসেবে প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে দেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে। একই অনুষ্ঠানে ১৫ জন প্রতিবন্ধীকে শুভেচ্ছা উপহার হিসেবে প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা রয়েছে।
অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে হাটহাজারী সরকারি কলেজ মাঠে মঞ্চ নির্মাণের কাজ চলছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের পৃথক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সড়ক ব্যবস্থাপনা, যানজট নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্নতা, আপ্যায়ন, স্বাস্থ্যসেবা, জরুরি চিকিৎসা, মাদ্রাসা ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিকে ঘিরে হাটহাজারী সংসদীয় আসনের বিভিন্ন ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, পৌরসভা এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট দুই ওয়ার্ডে বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকেও ধারাবাহিকভাবে প্রস্তুতি সভা করা হচ্ছে।
নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা
প্রধানমন্ত্রীর চট্টগ্রাম সফরকে সামনে রেখে পুরো সফরজুড়ে কয়েক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মহেশখালী, বাঁশখালী, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারীর বিভিন্ন কর্মসূচিস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদেরও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. জিয়াউদ্দিন জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করে নিতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
রাতে ঢাকায় ফেরার কথা
চট্টগ্রাম সফরের শেষ পর্যায়ে রোববার সন্ধ্যায় নগরীর রেডিসন ব্লু হোটেলে চট্টগ্রাম বিএনপির সাংগঠনিক সভায় যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। সেখানে চট্টগ্রাম বিএনপির সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করার কথা রয়েছে।
এরপর রাত ৯টা ২০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীর ঢাকার উদ্দেশে চট্টগ্রাম ত্যাগ করার কথা রয়েছে।
একদিনের এই সফরকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় প্রশাসনিক প্রস্তুতির পাশাপাশি দলীয় পর্যায়েও ব্যাপক কর্মতৎপরতা চলছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে যেমন উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে, তেমনি দীর্ঘদিনের উন্নয়ন, পুনর্বাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও যোগাযোগসংক্রান্ত বিভিন্ন দাবি তাঁর সামনে তুলে ধরার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় নেতারা।