মোহাম্মদ হোসেন সুমন:
ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী, জাতিসংঘ সংস্থা, আন্তর্জাতিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (INGO) এবং স্থানীয় এনজিওগুলোর সহযোগিতা ও অংশগ্রহণ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন হেলপ কক্সবাজারের নির্বাহী পরিচালক আবুল কাশেম।
তিনি বলেছেন, নারী ও কৃষকের উন্নয়নে কাজ করা সংগঠনগুলোর জন্য এ ধরনের উদ্যোগে অংশগ্রহণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। সরকারি উদ্যোগের সঙ্গে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো যুক্ত হলে কর্মসূচির সুফল আরও বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো সম্ভব।
আবুল কাশেম বলেন, ‘আমরা যারা মহিলাদের উন্নয়নের কাজ করি, আমরা যারা কৃষকের উন্নয়নের কাজ করি, আমাদের উচিত এই প্রকল্পে সাপোর্ট দেওয়া। কারণ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মহিলা ও কৃষকেরা উপকৃত হচ্ছে।’
পরিবার ও কৃষক—দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্ব
তার মতে, একটি পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা, খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে নারীর অবস্থান এবং পরিবারের আয়ের উৎস সরাসরি সম্পর্কিত। একইভাবে কৃষকের উৎপাদন সক্ষমতা ও আয় বাড়লে তার প্রভাব পুরো পরিবার এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে পড়ে।
তাই ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডকে শুধু সহায়তা প্রদানের একটি মাধ্যম হিসেবে না দেখে বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত একটি উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
আবুল কাশেম বলেন, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ও গ্রাম পর্যায়ে নারী, কৃষক, দরিদ্র পরিবার এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে বিভিন্ন স্থানীয় ও জাতীয় উন্নয়ন সংস্থা। মাঠপর্যায়ের এসব প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় বাস্তবতা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং জনগণের সঙ্গে তাদের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে।
‘সরকারি উদ্যোগের সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ের সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্ত করা গেলে প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সেবা ও সহায়তা পৌঁছানো আরও সহজ হবে,’ বলেন তিনি।
আন্তর্জাতিক সহায়তার নতুন সুযোগ
ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্র রয়েছে বলে মনে করেন হেলপ কক্সবাজারের নির্বাহী পরিচালক। তার মতে, শুধু অর্থায়ন নয়—কারিগরি সহায়তা, তথ্য ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল সেবা, সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ, গবেষণা, মনিটরিং ও মূল্যায়নেও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের ভূমিকা থাকতে পারে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের স্থানীয় পর্যায়ের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। এতে একদিকে সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়বে, অন্যদিকে স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থাগুলোও দীর্ঘমেয়াদে আরও কার্যকর অংশীদার হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে।
নারী উন্নয়ন ও কৃষি উন্নয়নকে একসঙ্গে দেখার আহ্বান
আবুল কাশেম বলেন, নারী উন্নয়ন এবং কৃষি উন্নয়নকে আলাদা দুটি বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ কমে আসছে। কৃষিনির্ভর বহু পরিবারে নারীরা সরাসরি কৃষিকাজ, গবাদিপশু পালন, হাঁস-মুরগি পালন, বীজ সংরক্ষণ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পারিবারিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
অন্যদিকে পরিবারের আয় ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষকের সক্ষমতা বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে নারী ও কৃষক—দুই জনগোষ্ঠীর উন্নয়নকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করলে একটি পরিবারের সামগ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা সম্ভব।
তিনি বলেন, ‘একজন কৃষকের আয় বাড়লে শুধু কৃষক নন, তার পরিবারও উপকৃত হয়। একইভাবে একজন নারীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়লে পরিবারের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।’
স্থানীয় সংগঠনকে অংশীদার করার আহ্বান
ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচি বাস্তবায়নে স্থানীয় এনজিও, কৃষক সংগঠন, নারী উন্নয়ন সংগঠন ও কমিউনিটি-ভিত্তিক সংগঠনগুলোকে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।
তার মতে, স্থানীয় সংগঠনগুলোকে শুধু বাস্তবায়নকারী হিসেবে নয়, পরিকল্পনা, কমিউনিটি পরামর্শ, তথ্য সংগ্রহ, মনিটরিং এবং জবাবদিহিতার প্রক্রিয়াতেও অংশীদার করা প্রয়োজন।
এতে কর্মসূচির স্বচ্ছতা ও জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে মালিকানাবোধ তৈরি হবে বলে মনে করেন তিনি।
সমন্বিত অংশীদারত্বের ওপর গুরুত্ব
আবুল কাশেম বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, স্থানীয় ও জাতীয় এনজিও, আন্তর্জাতিক এনজিও, জাতিসংঘ সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী, কৃষক সংগঠন ও নারী উন্নয়ন সংগঠন—সব পক্ষের মধ্যে সমন্বিত অংশীদারত্ব গড়ে তোলা গেলে ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ডের লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
তিনি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের উদ্দেশে বলেন, ‘বাংলাদেশের নারী ও কৃষকদের উন্নয়নে সরকারি উদ্যোগের পাশে দাঁড়ানোর এখনই সময়। স্থানীয় বাস্তবতা ও জনগণের প্রয়োজনকে সামনে রেখে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে কাজ করলে এর সুফল দীর্ঘমেয়াদে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব।’
তিনি আশা প্রকাশ করেন, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের লক্ষ্য বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ দায়িত্বশীল ও সমন্বিত ভূমিকা পালন করবে। বিশেষ করে নারী ও কৃষকের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সামাজিক সুরক্ষা এবং জীবিকা উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী হবে।
হেলপ কক্সবাজারের নির্বাহী পরিচালক একই সঙ্গে স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানান—নারী ও কৃষকের উন্নয়নে যারা দীর্ঘদিন ধরে মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন, তারা যেন নিজেদের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে এ ধরনের জনকল্যাণমূলক উদ্যোগে সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করেন।
তার মতে, জনগণকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে সরকার, স্থানীয় সংগঠন ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বিত উদ্যোগই পারে সামাজিক সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের কার্যক্রমকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই করতে।