আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইসরায়েলের রাজনীতিতে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছেন দেশটির সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোত। দীর্ঘ সামরিক জীবন পেরিয়ে রাজনীতিতে আসা এই সাবেক জেনারেল এবার নেতানিয়াহুবিরোধী জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সামরিক অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক অবস্থান এবং নেতানিয়াহুর সঙ্গে অতীতের কাজের সম্পর্ক—সব মিলিয়ে ইসরায়েলের বর্তমান রাজনীতিতে আলোচনায় রয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে ৬৬ বছর বয়সী আইজেনকোতকে। রাজনীতিতে তুলনামূলক নতুন হলেও ইসরায়েলিদের কাছে তিনি অপরিচিত নন। তাঁর জীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করে।
চার দশকের সামরিক জীবন
গাদি আইজেনকোত ১৯৭৮ সালে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর গোলানি ব্রিগেডে যোগ দেন। এরপর দীর্ঘ প্রায় চার দশকের সামরিক কর্মজীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সামরিক বাহিনীতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন আইজেনকোত। ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি এ পদে ছিলেন।
তাঁর সেনাপ্রধান থাকার সময় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। ফলে রাজনীতিতে প্রবেশের আগেই দেশটির নিরাপত্তা ও সামরিক নীতিনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ পরিসরে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন আইজেনকোত।
সেনাবাহিনী থেকে অবসরে যাওয়ার পর ২০২২ সালে রাজনীতিতে যোগ দেন তিনি। একই সময়ে রাজনীতিতে আসেন ইসরায়েলের আরেক সাবেক সেনাপ্রধান বেনি গানজ। সামরিক বাহিনীতে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা এই দুই ব্যক্তির রাজনীতিতে প্রবেশ ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দেয়।
নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় ছিলেন
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েলে জরুরি যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভা গঠন করেন প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। ওই মন্ত্রিসভায় যোগ দেন গাদি আইজেনকোত ও বেনি গানজ। সে সময় গাজায় যুদ্ধ পরিচালনা এবং পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে ইসরায়েলের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছিল।
তবে গাজার যুদ্ধের পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে মতপার্থক্য তৈরি হলে ২০২৪ সালের জুনে আইজেনকোত ও গানজ জরুরি যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে যান। এর মধ্য দিয়ে নেতানিয়াহুর সরকারের সঙ্গে তাঁদের রাজনৈতিক দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
গাজার যুদ্ধে ছেলেকে হারান
গাজায় যুদ্ধ চলাকালে ব্যক্তিগতভাবেও বড় শোকের মুখোমুখি হন আইজেনকোত। তাঁর পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছেলে গাল গাজার যুদ্ধ শুরুর দুই মাসের মধ্যে হামাসের গুলিতে নিহত হন। সামরিক জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও ছেলের মৃত্যু তাঁর পরিবারের জন্য গভীর শোকের ঘটনা হয়ে আসে।
নেতানিয়াহুর সঙ্গে জোটে অনাগ্রহ
নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আলোচনায় থাকলেও আইজেনকোতের রাজনৈতিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও তিনি নেতানিয়াহুর সঙ্গে জোট সরকার গঠন করতে চান না। তিনি জানিয়েছেন, নির্বাচনের ফল যাই হোক, নেতানিয়াহুর সঙ্গে মিলে সরকার গঠনের পথে যাবেন না।
এ অবস্থানের কারণে ইসরায়েলের সরকার গঠন নিয়ে নির্বাচনী সমীকরণে আইজেনকোতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে নির্বাচনের ফলাফল এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আসনসংখ্যার ওপরই শেষ পর্যন্ত সরকার গঠনের সম্ভাবনা নির্ভর করবে।
দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা, যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন এবং পরবর্তী সময়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে মতপার্থক্যের কারণে গাদি আইজেনকোত এখন ইসরায়েলের রাজনীতিতে আলোচিত এক মুখ। তাঁর নেতৃত্বাধীন নেতানিয়াহুবিরোধী জোট নির্বাচনে কী ফল করে, তা দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।