মোহাম্মদ হোসেন সুমন:
পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত—কক্সবাজার। দেশ-বিদেশের লাখো পর্যটকের পদচারণায় বছরজুড়েই মুখর থাকে এই পর্যটন নগরী। পর্যটনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে শত শত হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বিভিন্ন এনজিও সংস্থার কার্যক্রমও রয়েছে জেলাজুড়ে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—এত বিপুল মানুষের আনাগোনা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বের তুলনায় কক্সবাজারের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা কি যথেষ্ট?
সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ ও বিভিন্ন সময়ের ঘটনাপ্রবাহ বলছে, পর্যটনকেন্দ্রিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা, নজরদারি ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক কারবারসহ বিভিন্ন অপরাধের আশঙ্কা পর্যটননির্ভর এই জেলার জননিরাপত্তা ও ভাবমূর্তির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কক্সবাজারের অর্থনীতি বহুলাংশে পর্যটননির্ভর। ঈদের মতো দীর্ঘ ছুটিতে সৈকতে পর্যটকের ব্যাপক সমাগমের খবরও নিয়মিত সামনে আসে। পর্যটকদের নিরাপত্তায় প্রশাসন ও ট্যুরিস্ট পুলিশের বিভিন্ন কার্যক্রম থাকলেও বিপুল জনসমাগমের সময় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত ও সমন্বিত করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সৈকতের পাশাপাশি হোটেল-মোটেল জোন, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বাজার, বিনোদনকেন্দ্র, পর্যটন স্পট এবং শহরের প্রবেশপথগুলোতেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ পর্যটকের নিরাপত্তা শুধু সমুদ্রসৈকতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; পুরো পর্যটন নগরীর নিরাপদ পরিবেশের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। প্যারাসেইলিং, ওয়াটার বাইক, বিচ বাইকসহ বিভিন্ন অ্যাডভেঞ্চার কার্যক্রম পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এসব কার্যক্রম পর্যটনকে আকর্ষণীয় করলেও নিরাপত্তা, তদারকি ও অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে কক্সবাজার সৈকতের প্যারাসেইলিং কার্যক্রম নিয়ে আইনি নোটিশ দেওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
এতে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে—পর্যটন সম্প্রসারণের সঙ্গে নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও কি একই গতিতে এগোচ্ছে?
সচেতন মহলের মতে, অপরাধ সংঘটনের পর অভিযান চালানোর পাশাপাশি অপরাধ প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে আধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরা, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, নিয়মিত পুলিশ ও ট্যুরিস্ট পুলিশের টহল, দ্রুত অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা এবং পর্যটকদের জন্য দৃশ্যমান হেল্প ডেস্ক চালু রাখা যেতে পারে। একই সঙ্গে মাদক, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও সংঘবদ্ধ অপরাধের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি অপরাধীদের রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাব থেকে মুক্ত রেখে আইনের আওতায় আনার দাবি রয়েছে।
কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে আরও উন্নত করার পরিকল্পনার কথাও সরকারিভাবে সামনে এসেছে। তাই পর্যটন অবকাঠামোর উন্নয়নের পাশাপাশি জননিরাপত্তাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল। তাদের মতে, নিরাপত্তাহীনতার সামান্য একটি ঘটনাও দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে পর্যটন ব্যবসা, বিনিয়োগ ও কক্সবাজারের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি।
এ অবস্থায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সচেতন মহলের দাবি—কক্সবাজারের বিশেষ পর্যটন গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা ও জনবল আরও জোরদার করা হোক। একই সঙ্গে পর্যটন এলাকা, হোটেল-মোটেল জোন, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও জনবহুল স্থানে নিয়মিত টহল বাড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, অপরাধের হটস্পট চিহ্নিত করে বিশেষ অভিযান পরিচালনা এবং পুলিশ, ট্যুরিস্ট পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, কোস্টগার্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় আরও শক্তিশালী করার দাবি জানানো হয়েছে।
সচেতন মহলের ভাষ্য, কক্সবাজার শুধু একটি জেলা নয়—এটি বাংলাদেশের পর্যটনের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার। তাই এই শহরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে শুধু স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা নয়; বরং দেশের পর্যটন অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এখন দেখার বিষয়, পর্যটনের এই গুরুত্বপূর্ণ নগরীর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, শক্তিশালী ও কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করে।