মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী:
নারায়ণগঞ্জে বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতা ও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের শান্তিপূর্ণ সমাপ্তি হয়েছে। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, আনন্দ-উৎসাহ ও উৎসবমুখর পরিবেশে প্রতিমা বিসর্জনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। বুধবার (২১ অক্টোবর ২০২৬) দিবাগত রাত ৩টা ১৫ মিনিটে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানাধীন ৫ নম্বর ঘাটে সর্বশেষ প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে এ বছরের দুর্গোৎসবের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
উৎসবের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ঘাট ও আশপাশের এলাকায় ভক্ত-দর্শনার্থীদের উপস্থিতি ছিল। প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয় বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা। সার্বিক নজরদারি ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে বিসর্জনের কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।
নারায়ণগঞ্জে ২৪০টি পূজামণ্ডপে দুর্গোৎসব
জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এ বছর নারায়ণগঞ্জ জেলায় মোট ২৪০টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে ২১৪টি মণ্ডপের প্রতিমা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান মেনে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানাধীন ৫ নম্বর ঘাটে বিসর্জন দেওয়া হয়েছে।
বাকি মণ্ডপগুলোর মধ্যে ২৫টি মণ্ডপের প্রতিমা এ বছর বিসর্জন দেওয়া হবে না। অপর একটি মণ্ডপের প্রতিমা বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বিসর্জন দেওয়ার কথা রয়েছে।
ধর্মীয় রীতি ও আচার-অনুষ্ঠান অনুসরণ করে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে ভক্তরা দেবী দুর্গাকে বিদায় জানান। এ সময় অনেক ভক্তের মধ্যে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষে আগামী বছরের দুর্গোৎসবের প্রত্যাশা নিয়ে বাড়ি ফেরেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
উপজেলা ও থানাভিত্তিক বিসর্জনের চিত্র
জেলা পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন থানা এলাকায় প্রতিমা বিসর্জনের চিত্র ছিল ভিন্ন ভিন্ন।
নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানাধীন ৪৩টি মণ্ডপের মধ্যে ২টি, ফতুল্লা মডেল থানাধীন ২৯টির মধ্যে ৫টি, রূপগঞ্জ থানাধীন ৫৭টির মধ্যে ৯টি, আড়াইহাজার থানাধীন ৩৭টির মধ্যে ১টি এবং সোনারগাঁ থানাধীন ৩৮টি মণ্ডপের মধ্যে ৮টি মণ্ডপের প্রতিমা এবার বিসর্জন দেওয়া থেকে বিরত রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।
জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর প্রতিমা বিসর্জনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এ সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ঘাটকেন্দ্রিক কার্যক্রমে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিসর্জনস্থলে প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উপস্থিতি
প্রতিমা বিসর্জনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের ৫ নম্বর ঘাটে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট মো. সাখাওয়াত হোসেন খান, জেলা পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান, পিপিএম এবং মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট মো. আবু আল ইউসুফ খান টিপু।
এ ছাড়া জেলা পূজা উদযাপন কমিটির শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থেকে বিসর্জনের সার্বিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁরা অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করেন।
উৎসবের শেষ দিনেও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতি নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং সার্বিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নিরাপত্তায় মাঠে ছিল জেলা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট
প্রতিমা বিসর্জন নির্বিঘ্ন করতে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের সব অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি জেলা পুলিশ, জেলা বিশেষ শাখা (ডিএসবি), জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের সমন্বয়ে গঠিত কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) ঘাট ও আশপাশের এলাকায় মোতায়েন ছিল।
বিসর্জনস্থলে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ এবং সম্ভাব্য অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে ছিলেন। বিভিন্ন ইউনিটের সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিমা বিসর্জনের পুরো প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্ক দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। ঘাটে আগত ভক্ত ও দর্শনার্থীরা যাতে নির্বিঘ্নে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিতে পারেন, সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নজরদারি অব্যাহত রাখে।
কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর নেই
প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির মধ্যে এ বছরের প্রতিমা বিসর্জন অনুষ্ঠান শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, উৎসবে আগত নারী, শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিরা কোনো ধরনের হয়রানি বা নির্যাতনের শিকার হননি। নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার রাখার ফলে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিসর্জন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পেরেছেন।
তবে উৎসবের সার্বিক নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তৎপরতা পুরো অনুষ্ঠানজুড়েই অব্যাহত ছিল।
আনন্দঘন পরিবেশে দুর্গোৎসবের সমাপ্তি
শারদীয় দুর্গোৎসব সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। পূজা, অঞ্জলি, আরতি, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে উৎসবটি উদ্যাপিত হয়। শেষ দিনে প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।
নারায়ণগঞ্জে এ বছরের দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন আয়োজক ও ভক্তবৃন্দ। প্রশাসন, পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বিত উদ্যোগে বিসর্জন কার্যক্রম নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তাঁরা।
সব মিলিয়ে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, উৎসবের আনন্দ এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশের মধ্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জে শারদীয় দুর্গোৎসবের সমাপ্তি হয়েছে। আগামী বছর আরও সুন্দর ও উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গোৎসব উদ্যাপনের প্রত্যাশা নিয়ে শেষ হয়েছে এবারের আয়োজন।
প্রতিবেদক: মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী
ব্যুরো চিফ, নারায়ণগঞ্জ