ফেসবুকে ‘চাঁদপুরের ইলিশ’ কিনতে গিয়ে প্রতারণা, অগ্রিম টাকা হারাচ্ছেন ক্রেতারা

চাঁদপুর প্রতিনিধি:
চাঁদপুরের বিখ্যাত ইলিশের সুনামকে পুঁজি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একাধিক প্রতারক চক্র। ভুয়া ফেসবুক পেজ খুলে ‘চাঁদপুরের আসল ইলিশ’ সরবরাহের প্রলোভন দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ক্রেতাদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা আদায় করছে তারা। টাকা নেওয়ার পর মাছ তো দূরের কথা, যোগাযোগও বন্ধ করে দিচ্ছে প্রতারকরা। প্রশাসনের নানা উদ্যোগ ও সতর্কতা সত্ত্বেও কৌশল বদলে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে এসব চক্র।

জেলা প্রশাসন ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অনলাইনে ইলিশ বিক্রির নামে প্রতারণা রোধে গত বছরের ৯ অক্টোবর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এতে জানানো হয়, ভুয়া ফেসবুক পেজের মাধ্যমে চাঁদপুরের ইলিশ বিক্রির নামে প্রতারণা বেড়ে যাওয়ায় জেলা প্রশাসন যাচাই-বাছাই শেষে সাতটি প্রতিষ্ঠানকে অনলাইনে ইলিশ বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে। নিবন্ধিত এসব প্রতিষ্ঠান ক্যাশ অন ডেলিভারি পদ্ধতিতে মাছ সরবরাহ করে থাকে।

তবে বৈধ ব্যবসায়ীদের নাম, লোগো, ছবি ও পুরোনো ভিডিও ব্যবহার করে প্রতারকরা নতুন নতুন ফেসবুক পেজ খুলে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলছে বলে অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ী ও ভুক্তভোগীরা।

অগ্রিম ১১ হাজার টাকা পাঠিয়ে প্রতারণার শিকার

ঠাকুরগাঁওয়ের বাসিন্দা হিম জানান, প্রায় দেড় মাস আগে ফেসবুকে ‘ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর’ নামে একটি পেজের বিজ্ঞাপন দেখে তিনি ইলিশের অর্ডার দেন। প্রতারকরা অর্ডার নিশ্চিতের কথা বলে বিকাশ ও নগদে ১১ হাজার টাকা অগ্রিম নেয়। কিন্তু টাকা পাঠানোর পর আর কোনো মাছ পাঠানো হয়নি।

তিনি বলেন, “পরে মাছ বা টাকা ফেরত চাইলে তারা নানা অজুহাত দিতে থাকে। একপর্যায়ে জানায়, আমার নামে একটি অ্যাকাউন্ট খুলেছে, সেটি চালু করতে আরও টাকা দিতে হবে। তখন বুঝতে পারি এটি প্রতারণার ফাঁদ।”

তিনি আরও জানান, তার মতো আরও অনেক মানুষ একইভাবে প্রতারিত হয়েছেন। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং হারানো টাকা ফেরতের দাবি জানান তিনি।

শরীয়তপুরেও একই কৌশলে প্রতারণা

শরীয়তপুর সদর উপজেলার তুলাসার এলাকার বাসিন্দা মিন্টু মাদবর জানান, ‘রুপালি ইলিশের সেরা চাঁদপুর’ নামে একটি ফেসবুক পেজে যোগাযোগ করে তিনি ইলিশের অর্ডার দেন। প্রতারকদের কাছে ১১ হাজার টাকা পাঠানোর পরও তিনি কোনো মাছ পাননি।

‘ক্যাশ অন ডেলিভারি ছাড়া টাকা দেবেন না’

নিবন্ধিত অনলাইন ইলিশ বিক্রেতা খোকন পাটওয়ারী বলেন, জেলা প্রশাসনের অনুমোদিত ব্যবসায়ীরা কেবল ক্যাশ অন ডেলিভারি পদ্ধতিতে ইলিশ বিক্রি করেন। তিনি বলেন, “প্রতারকরা কম দামের প্রলোভন দেখিয়ে আগে টাকা নেয়, পরে মাছ দেয় না। তাই হাতে মাছ পাওয়ার আগে কোনোভাবেই টাকা পাঠাবেন না।”

চাঁদপুর মাছঘাটের ব্যবসায়ী মেসার্স আলম ট্রেডার্সের মালিক নুরুল আমিন বলেন, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পরিচালিত প্রতারক চক্র ভুয়া ফেসবুক পেজ ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলছে।

চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজী শবেবরাত আলী বলেন, দেশ-বিদেশের ক্রেতাদের ক্যাশ অন ডেলিভারি ছাড়া ইলিশ না কেনার আহ্বান জানানো হচ্ছে। পাশাপাশি টাকা লেনদেনের আগে বিক্রেতার পরিচয় যাচাই করারও পরামর্শ দেন তিনি।

প্রশাসনের সতর্কবার্তা

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. এরশাদ উদ্দিন বলেন, অনলাইনে ইলিশ বিক্রির নামে প্রতারণা ঠেকাতে সাতটি প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে গণমাধ্যম ও জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটে সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, “কেউ প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত নিকটস্থ থানায় অভিযোগ করুন। আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমানও তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্য কোনো অনলাইন পেজ থেকে ইলিশ কেনার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রতারণার শিকার হলে পুলিশ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার সতর্ক করা হলেও লোভনীয় অফার ও কম দামের প্রলোভনে প্রতারকদের ফাঁদে পা দিচ্ছেন অনেক ক্রেতা। তাই অনলাইনে ইলিশ কেনার ক্ষেত্রে অগ্রিম অর্থ পরিশোধ না করে ক্যাশ অন ডেলিভারি পদ্ধতি অনুসরণ এবং বিক্রেতার পরিচয় নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *